প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে আস্থা যুক্তরাষ্ট্রের, আরো বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি ওয়াশিংটনের দৃঢ় আস্থার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব আরো জোরদারকে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে আরো বেশি মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

গতকাল সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সার্জিও গর। সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।

তিনদিনের সফর শেষে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসও একটি বিবৃতি দেয়। পাশাপাশি বৈঠক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সেও পোস্ট করেন সার্জিও গর।

তিনদিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন সার্জিও গর। সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানায়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে এ সফর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপকতা ও গভীরতাকে তুলে ধরেছে।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে সার্জিও গর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এর প্রতিফলন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিদ্যমান ভ্রমণ সতর্কতা (ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি) ইতিবাচকভাবে সংশোধন করেছে। এতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাবে যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত।’

একই বিষয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে।

বৈঠক শেষে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সার্জিও গর বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং একসঙ্গে কাজ করলে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে আরো বেশি মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তিনি সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এসব খাতে বিনিয়োগ হলে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’ একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সার্জিও গর বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে আগামী মাসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের (ডিএফসি) মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। বিশেষ দূত জানান, বাংলাদেশে ডিএফসির বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা শিগগিরই একটি ইউএস ইনভেস্টর সামিট আয়োজন করতে আগ্রহী এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি নিজেও কাজ করছেন।

তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদারের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।’

মাহ্দী আমিন বলেন, ‘এ ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের সফর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরো গভীর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হবে।’

গত পাঁচ মাসে সরকারের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেছে মার্কিন প্রতিনিধি দল। মাহ্দী আমিন বলেন, ‘বহুমাত্রিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা বৃদ্ধির প্রতিফলন এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণ সতর্কতার বর্তমান অবস্থান মার্কিন বিনিয়োগকারী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত। এর ফলে মার্কিন উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে এসে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে পারবেন।’ এ সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মাহ্দী আমিন আরো জানান, বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধানরাও উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং দেশে একটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আরো দ্রুত ও সহজ করতে তাৎক্ষণিক কয়েকটি সিদ্ধান্তও নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা বিমানবন্দরসহ অন্যান্য বন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখতে ২৪ ঘণ্টা, সাতদিন সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশে এফডিএর পরীক্ষাকার্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সহায়তা করবেন বলে আশ্বাস দেন সার্জিও গর।

এর আগে সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করে সার্জিও গরের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দল। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রতিনিধি দলটি বিভিন্ন আশ্রয় শিবির, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করে এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে।

পরে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সার্জিও গর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রশংসা করেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকের বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। এজন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সফর শেষে শনিবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রেস ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সেলর মনিকা শাইয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরও পরিদর্শন করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এ সফর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপকতা ও গভীরতাকে তুলে ধরেছে।

আরও