বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার প্রথম সপ্তাহে ডলারের দরে বড় কোনো অস্থিরতা দেখা যায়নি। গত এক সপ্তাহে ব্যাংক খাতে প্রতি ডলার ১২২-১২৩ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। তবে হজযাত্রীদের প্রভাবে কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) প্রতি ডলার ১২৭ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ১৪ মে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ওইদিন গভর্নর বলেছিলেন, ‘দেশে ডলারের বিনিময় হার কত হবে, সেটি বাজারই নির্ধারণ করবে। ব্যাংকগুলো প্রতিদিন দুবার ডলার বেচাকেনার তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি থাকলেও কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।’
বিনিময় হার বাজারে ছেড়ে দেয়া হলে দেশে ডলারের দর অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে বলে অনেকের আশঙ্কা ছিল। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এ বিষয়ে উদ্বেগ ছিল খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও। বাজার অস্থিতিশীল হলে ডলার বিক্রির মাধ্যমে স্থিতিশীল করার জন্য ৫০ কোটি ডলারের বিশেষ তহবিলও গঠন করা হয়েছিল। তবে গত এক সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে বাজারে ডলার সরবরাহ কিছুটা কমলেও দর স্থিতিশীল ছিল। বাজারে অস্থিরতা তৈরি না হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো ডলার বিক্রি করতে হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে ডলারের বাজারে তেমন কোনো অঘটনের তথ্য আমরা পাইনি। ব্যাংকগুলোর ডলার বেচাকেনায় দর আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। মানি এক্সচেঞ্জগুলোয় দর কিছুটা বেশি হলেও সেটিকে আমরা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না। কারণ বাংলাদেশে কার্ব মার্কেটের আকার খুবই ছোট। হজ মৌসুম হওয়ায় কার্ব মার্কেটে ডলারের বাড়তি চাহিদা আছে। বিনিময় হার উন্মুক্ত করে দিলেও আমরা বাজারকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘বাজার অস্থিতিশীল হলে ডলার সরবরাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে। গত এক সপ্তাহে এ তহবিল থেকে কোনো ডলার বিক্রির প্রয়োজন হয়নি। প্রাথমিক ধাক্কা যেভাবে সামাল দেয়া গেছে, তাতে ভবিষ্যতেও কোনো ডলার বিক্রি করতে হবে বলে মনে করছি না। গত নয় মাসে কোনো ডলার বিক্রি না করেও আমরা বাজার স্থিতিশীল রাখতে পেরেছি।’
দেশের চারটি ব্যাংকের ডলার কেনাবেচার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দরে অস্থিরতা না থাকলেও গত এক সপ্তাহে ব্যাংকগুলোর ডলারপ্রবাহ কিছুটা কমেছে। ঘোষিত দরে ব্যাংকগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী রেমিট্যান্সের ডলার কিনতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৪ থেকে ১০ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কিন্তু ১১ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৭০ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার সপ্তাহে প্রায় ১১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স কম এসেছে। যদিও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে রেমিট্যান্স বাড়ার কথা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে ডলারের দাম বাড়ার একটি গুঞ্জন আছে। এ কারণে প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি অংশ রেমিট্যান্স ধরে রেখেছেন। আবার দুবাইভিত্তিক অ্যাগ্রিগেটর ও হুন্ডি কারবারিরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে জমা করছেন। এ কারণে দর স্থিতিশীল থাকলেও বাজারে ডলারের প্রবাহ কিছুটা কমে গেছে।’
ওই শীর্ষ নির্বাহী আরো বলেন, ‘রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে হুন্ডি কারবারিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও দূতাবাসগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। এক মাস যদি কঠোরভাবে বাজার তদারক করা যায় তাহলে দেশে ডলারের বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে যাবে।’
অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, কাগজে-কলমে দেশে ৬১টি ব্যাংক থাকলেও এ মুহূর্তে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সক্রিয় ব্যাংকের সংখ্যা ১৫ থেকে ১৭টি। এগুলোর মধ্যে নয়টি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন চালাচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ডলার বেচাকেনায় অনেক বেশি সতর্ক। ব্যবসায়ীরা সাইট এলসি বেশি করছেন। বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় কেউ ডেফার্ড এলসি খুলতে চাচ্ছেন না।
রেমিট্যান্সের বাজারে খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও রফতানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। বেসরকারি এ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের ৫ আগস্টের পর প্রতি মাসে ১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স বেশি আসছে। তার মানে বাড়তি এ রেমিট্যান্স আগে হুন্ডিতে চলে যেত। মার্চে আমাদের রেমিট্যান্স এসেছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আমি মনে করি, হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর হলে আমরা প্রতি মাসে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আনতে পারব। এটি সম্ভব হলে দেশের বাজারে ডলারের বিনিময় হার ও সংকট সবই পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে যাবে।’
বিদেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বৈশ্বিক মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ড। মার্কিন এ কোম্পানির বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করায় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাগত ও ধন্যবাদ জানাই। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক ঘোষণার পর গত এক সপ্তাহ দেশে ডলারের বাজার স্থিতিশীল আছে। এক্ষেত্রে আমরাও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রবাসীরা বাড়তি রেমিট্যান্স দেশে পাঠাবেন। আশা করছি, গত সপ্তাহের মতো আগামীতেও ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং প্রবাসী বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা বৈধ পথে আরো বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবেন।’
প্রসঙ্গত, দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে প্রায় চার বছর ধরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এর পর থেকেই ডলারের বাজারে অস্থিরতা চরমে ওঠে। এক বছর পর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১০৩ টাকায় ঠেকে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ডলারের দর ১১০ টাকায় উঠে যায়। জুনে এসে বিনিময় হার নির্ধারণে ক্রলিং পেগ নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এক ধাক্কায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১৮ টাকায় উঠে যায়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বিনিময় হার আরো বেড়ে ১২০ টাকায় স্থির হয়। আর বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার দিন তথা ১৪ মে ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা। গতকাল ব্যাংক খাতে ডলারের সর্বোচ্চ দর ১২২ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে গত এক সপ্তাহ কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার ১২৬ টাকার মধ্যে লেনদেন হলেও গতকাল তা ১২৭ টাকা পর্যন্ত উঠে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।