ময়মনসিংহের ১১ আসনের ৮টিতেই বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলার ১১টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রচারণা ক্রমেই জমজমাট হয়ে উঠছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলার ১১টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রচারণা ক্রমেই জমজমাট হয়ে উঠছে। সারা দেশে যেখানে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট, এখানে জামায়াত নয়, বরং বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলীয় বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে মোট ৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় থাকায় ভোটের সমীকরণ দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থীই অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারেন।

ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট–ধোবাউড়া): এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহের বিপরীতে নির্বাচনে নেমেছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত রুবেল এর আগে বিএনপি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ধোবাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। আসনটিতে অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মো. তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) থেকে কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. জিল্লুর রহমান।

ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা): এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। তিনি তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ্ শহীদ সারোয়ার। এবার তিনি ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের মুহাম্মুদ্দুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের গোলাম মাওলা ভূঁইয়া, কলস প্রতীকে স্বতন্ত্র মোহাম্মদ আবু বকর ছিদ্দিক, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের মো. এমদাদুল হক খান এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির একতারা প্রতীকের প্রার্থী মো. জুলহাস উদ্দিন শেখ।

ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর): ময়মনসিংহ-৩ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন নির্বাহী কমিটির সদস্য এম ইকবাল হোসাইন। দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে সদ্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন—বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) মনোনীত কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী একেএম আরিফুল হাসান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির বই প্রতীকের প্রার্থী মো. আবু তাহের খান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. শরিফুল ইসলাম।

ময়মনসিংহ-৪ (সদর ও সিটি করপোরেশন): এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ। এখানে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ কামরুল আহসান এমরুল। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন—জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের আবু মো. মূসা সরকার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের এমদাদুল হক মিল্লাত, গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মো. নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির একতারা প্রতীকের মো. লিয়াকত আলী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আম প্রতীকের মো. হামিদুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) মনোনীত কাস্তে প্রতীকের শেখর কুমার রায়।

ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা): এ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বাবলু। তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং এবি পার্টির ঈগল প্রতীকের মো. রফিকুল ইসলাম।

ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের উপজেলা আহ্বায়ক মো. আখতারুল আলম। তবে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নাম নিয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি আখতার সুলতানা।

এ আসনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির কামরুল হাসান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন।

ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল): এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান লিটন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তবে সাবেক এমপি আব্দুল খালেকের ছেলে ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আনোয়ার সাদাত স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আছাদুজ্জামান সোহেল।

ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ): ময়মনসিংহ-৮ ঈশ্বরগঞ্জ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্য বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনে যোগদানকারী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ নূরুল কবির শাহিন।

ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল): ময়মনসিংহ-৯ আসনে বিএনপি মনোনীত উপজেলা আহ্বায়ক ইয়াসের খান চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন ইয়াসের খানের চাচি এবং সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী। এ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন (ফুলকপি প্রতীকে), গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকের মো. লতিফুল বারী হামিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের মো. সাইদুর রহমান এবং জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীকের হাসমত মাহমুদও মাঠে রয়েছেন।

ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও): এ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, যিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হাঁস প্রতীকের আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান।

ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা): শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী উপজেলা আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে অংশ নিয়েছেন।

এছাড়া ১১ দলীয় জোটের শাপলা কলি প্রতীকের ডা. জাহিদুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মো. মোস্তফা কামালও মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলায় ১১টি সংসদীয় আসনে ভোটার রয়েছে ৪৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪ লাখ ৬ হাজার ৮৯২ জন, নারী ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৬৬ ভোট ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪১ জন।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। কোনো কেন্দ্রে অপ্রীতিকর কিছু ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোরভাবে তা দমন করা হবে।’

আরও