সাভারে ধলেশ্বরী ছিল একসময় স্বচ্ছ জলের নদী। কারখানার বর্জ্যের কারণে জলের সেই স্বচ্ছতা আগেই হারিয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীতে এখন বইছে কেমিক্যালযুক্ত পানির স্রোত। দূষণ আর মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়ামের প্রভাবে পানিতে নেই পর্যাপ্ত অক্সিজেন। প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে নদীর জীববৈচিত্র্য। দূষিত পানির দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে আশপাশের গ্রামেও। একসময় মানুষের জীবন-জীবিকার নির্ভরতার এ নদী এখন হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
নদী গবেষকরা বলছেন, হেমায়েতপুরের বিসিক চামড়া শিল্প নগর থেকে বর্জ্যমিশ্রিত পানি গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে। এতে নদীপাড়ের জলজ উদ্ভিদ রাসায়নিকের প্রভাবে বিবর্ণ হয়ে গেছে। নদীর পাড়ঘেঁষে ডাম্পিং ইয়ার্ডে ট্যানারির কঠিন বর্জ্যগুলো বিশেষ করে চামড়ার ব্যবহার অনুপযোগী অংশগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্যের রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি চলে যায় নদীতে।
জানা যায়, বর্তমানে ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপন্ন হয়। অথচ এখানকার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) দৈনিক পরিশোধনক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটারের মতো। বাকি প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য কোনো ধরনের ট্রিটমেন্ট ছাড়াই ধলেশ্বরীরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া যেটা সলিড বেজড বা কঠিন বর্জ্য, সেটা পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেই। একটি চামড়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াকরণে ক্ষতিকারক টিডিএস, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, জিংকের মতো ২০০-২৫০ ধরনের কেমিক্যাল দরকার হয়। কেমিক্যাল মিশ্রিত এসব বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে মিশে পানিতে থাকা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যাপক ক্ষতি করছে। নষ্ট করছে জলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোরবানির ঈদ-পরবর্তী দুই-তিন মাস ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় ট্যানারি থেকে প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটারের কম পরিমাণ, যা গড়ে ১৮-২০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য সিইটিপিতে আসে। সিইটিপি ফিজিক্যাল, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। বর্জ্যের পরিমাণ বাড়লে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে ট্রিটমেন্ট ত্বরান্বিত করা হয়। এছাড়া কঠিন বর্জ্য আমরা এক্সপোর্টের পারমিশন দিয়েছি। তিন-চারটি কারখানা এক্সপোর্ট করছে। তবে ক্যাডমিয়াম বা আর্সেনিক ট্যানারিতে ব্যবহার হয় না। ট্যানারিতে সাধারণত ক্রোমিয়াম ব্যবহার হয়।’
হেমায়েতপুরের বিসিক চামড়া শিল্পনগরে গিয়ে দেখা যায়, চামড়া বর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে অতিমাত্রায়। পাশাপাশি দূষণ ছড়াচ্ছে নদীর আশপাশ এলাকার পানি, মাটি, বায়ু এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশে।
ধলেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষা জামির্তা ইউনিয়নের বিন্নাডাঙ্গী গ্রামের গরুর খামারি দ্বীন ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে গরু নদীর পাড়েই ঘাস খেত, নদীর পানিও পান করত। গরুকে নদীতে গোসল করাতাম। এখন নদীর পানি পান করা তো দূরের কথা, ওই পানি দিয়ে গরুকে গোসল করালে অসুখ হয়। নদীপাড়ের ঘাসও মরে গেছে।’
একই এলাকার জেলে মো. রিপন মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নদীতে মাছ ধরছি। আগে বোয়াল, আইড়, বাগাইড়, চাপিলা, জাটকা, কাজলি, বাছা মাছ ধরতাম। বিভিন্ন কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি নদীতে আসার পর থেকে আগের মতো আর মাছ পাই না। এখন বড় মাছ তেমন পাওয়া যায় না। টেংরা, পুঁটি, বাইম আর বর্ষা মৌসুমে দুই-একটা বোয়াল ও বাগাড় পাওয়া যায়। মাছের স্বাদও আগের মতো নেই, কেরোসিনের গন্ধ আসে মাছ থেকে।’
ধল্লা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধল্লা গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘ট্যানারি বর্জ্যের প্রভাবে নদীতীরবর্তী কৃষিজমির উর্বরতা কমে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। কারণ আগে শুধু জৈব সার দিয়েই ফসল উৎপাদন করা যেত। এখন সেখানে অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। এ এলাকায় শুধু পানি আর মাটিই দূষিত হয়নি, বাতাসেও ছড়িয়েছে বিষ। কেননা রুপার কোনো অলংকার পরে এলাকায় চলাফেরা করলে রঙ কালচে হয়ে যায়।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চারটি প্যারামিটারে ধলেশ্বরী নদীর পানি পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মিলিগ্রাম পানিতে এসিডের মাত্রা ৭ দশমিক ৭৫, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ৬ দশমিক শূন্য-৯ দশমিক শূন্য। অক্সিজেনের মাত্রা দশমিক ৩, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ৫। কঠিন পদার্থের মাত্রা ৬৯৮, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ১০০০। ক্রোমিয়ামের মাত্রা দশমিক ৭০, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা দশমিক ৫।’
পানি পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাসিড এবং কঠিন পদার্থের মানগুলো গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকলেও অক্সিজেন এবং ক্রোমিয়ামের মানগুলো আদর্শ মানের চেয়ে বেশি। এর অর্থ হলো পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কম এবং উচ্চ ধাতব ঘনত্ব থাকতে পারে, যা জলজ জীবন এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।