জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে সফল ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এবারের সফরের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, সম্মান ও আত্মমর্যাদা নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।
আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। চার দিনের সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি দেশের উদ্দেশে রওনা হন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে দেশে পৌঁছান।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের জন্য এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম অংশগ্রহণ। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীও প্রথমবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিনজন প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের এ বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় দেশের মর্যাদা আরো বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে একটি ভাষণ, সাতটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য, ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘসহ ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্ক পর্বে বাংলায় দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, দেশ পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’— রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন—কৌশল, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
একই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবেলায় সংলাপ ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু পরিবর্তন ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, মিয়ানমারে সহিংসতার অবসান, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন বলে জানান তিনি।
সফরকালে তুরস্ক ও ইরানের রাষ্ট্রপতি, মালদ্বীপের উপ-রাষ্ট্রপতি, ভুটান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী, বোয়িং গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্বিক বিবেচনায় এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সার্থক হয়েছে। বিভিন্ন সভা ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অতিথিরা বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তার ভাষায়, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ‘আত্মবিশ্বাস, সম্মান এবং আত্মমর্যাদা নতুন উচ্চতায়’ উন্নীত করেছেন।