বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের সাধারণ গাড়িচালক ছিলেন সুমন মোল্লা। স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাবেন, সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করবেন। সংসারের ঋণ শোধ করবেন, স্ত্রীর বিক্রি করা গহনা ফিরিয়ে দেবেন। সেই স্বপ্নই আজ তাকে ঠেলে দিয়েছে সৌদি আরবের এক অচেনা মরুপথে, যেখানে হাতে নেই একটি রিয়ালও। গত তিন মাস ধরে কোনো কাজ ছাড়াই দালালদের কাছে একবেলা আধপেট খেয়ে, দুবেলা না খেয়ে অনাহারে দিন কাটছে তার। প্রতারণার শিকার হয়ে সবশেষ ঠাঁই হয়েছে রাস্তায়।
তিন মাস আগেও সুমন মোল্লা দেশে ছিলেন। এলাকার দুই পরিচিত মুখ ইসমাইল ফকির আর শহীদুল তাকে দেখিয়েছিল বিদেশের স্বপ্ন। ইসমাইল সৌদি আরবে থাকেন, মাঝেমধ্যে দেশে ফেরেন। তার কথায় ভরসা পেয়ে দালাল শহীদুলের মাধ্যমে সুমন মোল্লা রাজি হয়ে যান সৌদি যেতে। কথা ছিল ড্রাইভিং ভিসা দিবে, চুক্তি হলো ৪ লাখ টাকায়। জাগরণ সংস্থা থেকে ঋণ নিলেন ২ লাখ টাকা। আরেক এনজিও থেকে আরো ৬০ হাজার। জমি বন্ধক রেখে পেলেন আরো ৬০ হাজার। তারপরও সব জোগাড় হলো না। তখন স্ত্রীর সোনার কানের দুল, চেইন, আংটি বিক্রি করে হলো। এভাবে জোগাড় করেন বাকি টাকা। শহীদুল টাকা নিলেন কয়েক দফায়—একবার নগদে, একবার চেকে। একটি পরিবারের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার সেই মুহূর্তের ভিডিও এখনও আছে সুমন মোল্লার ফোনে।
সৌদি আরবের মাটিতে পা দেয়ার পর থেকেই শুরু হলো অন্য গল্প। যে ইসমাইল বলেছিলেন নিজে রিসিভ করবেন, তিনি বিমানবন্দরেই এলেন না। দেড় ঘণ্টা একা দাঁড়িয়ে থাকলেন সুমন। শেষমেশ এল অন্য একটি গাড়ি, অন্য একজন দালাল। সেদিন থেকে শুরু হলো এক দালাল থেকে আরেক দালালের কাছে ছুঁড়ে দেয়ার খেলা। ড্রাইভিং ভিসায় এসে দালালের বাসায় দুই মাস কাজহীন থাকার পর তাকে দেয়া হলো প্যাকেজিং কারখানার কাজ। এক সপ্তাহ কাজ করে পেলেন মাত্র ৫০০ রিয়াল, সেখান থেকেও দালাল কেটে নিল ২০০ রিয়াল।
এরপর পাঠানো হলো নির্মাণকাজে। ১৮ থেকে ২০ বস্তা সিমেন্ট মেখে গাঁথুনির কাজ, যা তিনি জীবনে কখনো করেননি। কাজের লোকেরা অভিযোগ করল দালালের কাছে, দালাল তাকে পাঠাল আরেক দালালের কাছে। সেই দালালও টাকা পায়নি ঠিকমতো, তাই পাঠাল আরেকজনের কাছে। এভাবে তিন মাস কাটল সুমনের—না হলো স্থায়ী কোনো কাজ, না মিলল ন্যায্য মজুরি, না দেখা করল ইসমাইল বা শহীদুল। দূর থেকে ফোনে ইসমাইল বলতেন, ‘ধৈর্য ধর, দেখমু’। শহীদুল বলতেন, ‘ইসমাইলকে বলো।’ ইসমাইল বলতেন, ‘শহীদুল বুঝবে।’ এভাবে তিনটি মাস পাড় হয়ে গেল।
দেশে সুমনের সংসার চলছে না। মাসে ২৫ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। ঋণের টাকা নিতে কিছুদিন পরপরই বাড়িতে মানুষ আসে। সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, স্ত্রী কোথায় পাবেন—এ প্রশ্নের ভার বুকে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক দালালের দরজা থেকে আরেক দালালের দরজায়। দুদিন পরপর জুটত অল্প ভাত, তেল ছাড়া আলুভর্তা। সেই ছবিও তুলে রেখেছেন তিনি।
সুমন মোল্লা বলেন, ‘আমি তখন পাগলপ্রায় হয়ে চিল্লাচিল্লি করেছি আর কতদিন আমি এভাবে থাকব? আমার মাথায় তখন দুনিয়ার চিন্তা—বাড়িতে কিস্তি পড়ে আছে, ঘরে চাল নাই, পোলাপানরে খাওন দিতে পারতাছি না। পাওনাদাররা এসে বাড়িতে বসে থাকে। আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো এক দালালের কাছে। সেই দালাল তো সাফ জানাইয়া দিল, আমরা তো শুধু কোনোমতে জীবন বাঁচানোর আশ্রয় দেই, কাজ বা ভালোমন্দ খাওন দিতে পারব না। ’
সবশেষ দালালরা সুমনকে একটি ড্রাইভিংয়ের কাজ দেয়ার কথা বলে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে একটি অচেনা জায়গায় পাঠিয়ে দেয়। সেখানে পৌঁছার পর কেউই নিতে আসেনি। ট্যাক্সির ভাড়া দেয়ার মতোও টাকা ছিল না সুমনের। টাকা দিতে না পারায় ট্যাক্সিচালক সুমনের পাসপোর্ট আটকে রাখেন। একপর্যায়ে কান্নাকাটি করলে আশেপাশের বাংলাদেশীরা সহযোগিতা করেন। বর্তমানে একটি সবজি খামারে সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে সুমন মোল্লার।
সুমন মোল্লা বণিক বার্তা বলেন, ‘সৌদি আরবে বেডিং কাঁধে নিয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি আর কানছি। ক্ষুধার কষ্ট কাউরে কইতে পারি নাই। দালালরা আমারে ঠিক মতো খাওন দেয় নাই। ভাত দিত একটু আর আলু ভর্তা। তাও মাঝে মাঝে খাওন দিত না। রুটি খাইতাম। আমার শরীর অসুস্থ হইয়া গেছে না খেয়ে। একটা টয়লেটের পাশে জুতার র্যাকের কাছে ফ্লোরে আমারে থাকতে দিছিল। ইসমাইল আর"শহীদুল আমার লগে একদিন দেখাও করে নাই। ফোনে শুধু বলে এ কাজ দিব, ওই কাজ দিব কিন্তু দেয় না। কাজ দেয়ার জন্য আমার বউর কাছে আবার দুই লাখ টাকা চায়। হয় আমারে এক বছরের আকামা করে কোনো ভালো কাজে দেউক। না হলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমারে দেশে পাঠাইয়া দেউক।’