দেশে প্রতি বছর কোরবানির পর পশুর চামড়ার দাম নিয়ে একধরনের সংকট দেখা যায়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে এ অস্থিরতা। আসন্ন ঈদেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারাই মূলত মাঠ পর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রফতানি একেবারে তলানিতে থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোরবানির পশুর চামড়া অনেকেই বিভিন্ন মাদ্রাসায় দান করেন। মাদ্রাসা থেকে চামড়া কিনে নেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত ‘চামড়া শিল্প রক্ষা কমিটি’ নামে একটি প্লাটফর্ম থেকে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। এ প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও জাতীয় ইমাম পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতি মুফতি আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি মাদ্রাসা থেকে চামড়া কিনতে হবে। সবকিছুর দাম বাড়লেও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বাড়ানো হয়নি। পশু কোরবানিতে সারা দেশে মাদ্রাসার ছাত্র, আলেম-ওলামারা কাজ করেন। অথচ সরকার নির্ধারিত দামও পাওয়া যায় না।’
তিনি জানান, প্রতি পিস চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে খরচ হচ্ছে ২৭০-৩২০ টাকা। এতে অনেক সময় সংরক্ষণের খরচও উঠে আসে না। তাই অনেকে বিগত সময়ে চামড়া বিক্রি না করে নষ্ট করে ফেলেন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চামড়া খাতে বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় ৯১ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৯২ শতাংশ খেলাপি। খেলাপি ঋণের ৯৬ শতাংশ অনেক পুরনো। এর মধ্যে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ আদায় করতে না পেরে ব্যাংক অবলোপন করেছে। চামড়া রফতানিতে ঋণ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, চামড়াজাত পণ্যে ৬০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা দেয়া হয়েছে শিল্প ঋণ ও চলতি মূলধন হিসেবে। আশির দশকে এ খাতে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবই এখন খেলাপি। নব্বইয়ের দশকে কিছু ভালো উদ্যোক্তা এসেছেন, তারা এখন এ খাতের সফল ব্যবসায়ী। মূলত তাদের ঋণই নিয়মিত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আয় করতে হলে প্রতি বছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৪০ শতাংশ হারে। সেজন্য এ খাতের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুসারে, আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে বিটিএর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছরই রফতানি কমছে। পরিবেশগত কিছু আপত্তির কারণে বিদেশীরা আমাদের থেকে পণ্য নেয় না। এ সমস্যার সমাধান এবং এলডব্লিউজি সনদ পেতে গেলে সিইটিপি প্লান্ট লাগবেই। ২০১৩ সালে এ প্লান্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তখন চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এ কাজ দেয়া হয়। তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল ১৮ মাসে এটির কাজ সম্পন্ন করার। কিন্তু আট বছর পর ২০২১ সালেও তারা এটি সম্পন্ন করতে পারেনি। তখন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) তাদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেয়। অসম্পন্ন কাজের টাকা কেটে রাখা হয় ওই কোম্পানির কাছ থেকে। আমাদের কথা হচ্ছে এ টাকা কী করবে? আজও কাজটি করা হয়নি। তাই আমি মনে করি আজ ট্যানারি শিল্পের এ অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে একটা ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’
বিটিএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ট্যানারিগুলো কমপ্লায়েন্স করতে না পারায় এ দুরবস্থা। এখন পরিবেশগত সমস্যা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে না হলে পশ্চিমা দেশ ও বড় ব্র্যান্ডগুলো আমাদের থেকে কোনো রকম পণ্য নেয় না। ফলে আমরা খুবই কম দামে চীনের কাছে প্রসেসড চামড়া বিক্রি করি। সেটি তারা নিয়ে বড় বড় ব্র্যান্ডের কাছে বিক্রি করে।’ প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় প্রচুর পরিমাণে পশুর চামড়া সংগ্রহ করে কোম্পানিগুলো। কিন্তু ১৫ বছর ধরে কাঁচা চামড়ার দাম অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে। পর্যাপ্ত রফতানি না হওয়া এবং রফতানিতে ভালো দাম না পাওয়া, বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া কেনার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে ক্রমেই কমছে এর দাম।
কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত সাভার চামড়া শিল্পনগরীর এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহফুজুর রহমান (রিজওয়ান) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর চামড়ার দাম কেমন হবে সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে দাম যেন ভালো হয় সেটি চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে আন্তর্জাতিক সনদের কথা বলা হচ্ছে বারবার। কিন্তু আমাদের দেশের বাজারেও কিন্তু নিজেদের চামড়াজাত পণ্যের তেমন কোনো হিস্যা নেই। এখন একটি জায়গায় পড়ে না থেকে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি এবং দেশের বাজারে উপস্থিতি বাড়ানোর মাধ্যমেও এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়া যায়। আফ্রিকাসহ বহু দেশে এলডব্লিউজি সনদ প্রয়োজন হয় না। আমরা কিন্তু সেসব সুযোগও কাজে লাগাতে পারছি না। ফলে এ খাতের উন্নয়ন করতে হলে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি এবং বিভিন্ন বাজার ধরতে হবে যতটুকু সুযোগ আছে তার মধ্যেই। তাহলেই কাঁচা চামড়ার দাম আরো বাড়নো সহজ হবে।’
২০১৯ সালে দেখা যায় গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ আর ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকায় কেনা হয়। সারা দেশে প্রতি বর্গফুট ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ১৮-২০ টাকা। ২০২০ সালে গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয় ৩৫-৪০ টাকা ও ঢাকার বাইরে ২৮-৩২ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়া ১৩-১৫ টাকা। ২০২১ সালে ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত হয় ৪০-৪৫ ও ঢাকার বাইরে ৩৩-৩৭ টাকা প্রতি বর্গফুট। সে বছর ছাগলের চামড়া ১৫-১৭ টাকা। ২০২২ সালে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় ৪৭-৫২ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৪০-৪৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ছাগলের চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা। ২০২৩ সালে গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৫০-৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪৫-৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ১৮-২০ টাকা। ২০২৪ সালে ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৫-৬০ ও ঢাকার বাইরে ৫০-৫৫ টাকা প্রতি বর্গফুট। ছাগলের চামড়া ২০-২৫ টাকা।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল ট্যানারি শিল্পের ঠিকানা। কিন্তু সেখানে ছিল না আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আবার লোকালয়ের কাছে হওয়ায় এর দূষণ বিপর্যস্ত করছিল স্থানীয়দের, দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরাতে ২০০৩ সালে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প হাতে নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। মোট ১২ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় নগরী। ২০১৭ সালে বিসিকের নেতৃত্বে হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর হয় ট্যানারি শিল্প। কিন্তু সেখানে সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (সিইটিপি) কাজ শেষ হলেও ডিজাইন গত জটিলতার কারণে এটিকে এখনো সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এলডব্লিউজির নির্ধারিত ১৭টি মানদণ্ডের মধ্যে চলতি বছরে এসে মাত্র তিনটি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে ট্যানারির দূষিত পানি মিশতে থাকে ধলেশ্বরীতে। নতুন শিল্পনগরীও আগের মতোই দূষণ ছড়াচ্ছে। ফলে রফতানির ক্ষেত্রে কোনো উন্নয়ন ঘটেনি এ খাতের, যা প্রভাব ফেলছে মাঠ পর্যায়ে কাঁচা চামড়ার দামেও।