অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে আগামী তিন অর্থবছর ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা আরো বেড়ে গড়ে প্রায় ৮৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের সঙ্গে উত্থাপিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি (২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯) পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা যায়।
বিশ্বের দেশে দেশে বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের ক্ষেত্রে কেবল একটি নয়, বিভিন্ন খাতের ওপর নির্ভর করা হয়। মূলত বন্ড বাজার, জাতীয় সঞ্চয় স্কিম, ব্যাংক ঋণ, পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে আসে কমতি অর্থ। সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এমনকি প্রতিবেশী ভারতও বন্ড বাজারকে ঘিরে বিস্তৃত বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তুলেছে। এসব দেশের সরকারি বন্ডে ব্যাংকের পাশাপাশি পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বিনিয়োগকারী এমনকি বিদেশী সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগ করে থাকে। সরকারি বন্ডের বহুমুখী বাজার গড়ে তুলেছে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোও। যদিও বাংলাদেশে বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর মধ্যে প্রধানত দেশের ব্যাংক খাতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের অবদান ৮৮ শতাংশের ওপর উঠতে পারে বলে অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন রয়েছে। এ সময় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেয়া হবে ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা অর্থায়নের মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা বা ৮৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ব্যাংক খাত থেকে সংগ্রহের প্রক্ষেপণ রয়েছে সরকারের। পরের অর্থবছরে (২০২৮-২৯) এ হার দাঁড়াতে পারে ৮৬ দশমিক ৪১ শতাংশে। এ সময় স্থানীয়ভাবে ঘাটতি পূরণে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক থেকে নেয়া হবে ১ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
কয়েক বছর আগেও বন্ডের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু প্রায় চার অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি (মোট নতুন বিক্রি—পুরনো সঞ্চয়পত্রের আসল পরিশোধ) ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে ব্যাংকের ওপর আরো বেড়েছে সরকারের নির্ভরতা।
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার এ প্রবণতা বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটের ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বা প্রায় ৮৪ দশমিক ৭২ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ নির্ভরশীলতার মাত্রা হিসাব করা হয়েছে ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ। এ সময় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যদিও এর প্রকৃত পরিমাণ ও হার এ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও বহুমুখী বন্ডের বাজার গড়ে না ওঠায় বাজেট ঘাটতির অর্থায়নে সরকারের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ব্যাংক ব্যবস্থা। আমানতের চেয়ে সুদহার কম হওয়ায় সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সরকারি ঋণপত্রে। সরকার নিজে ব্যাংক ঋণের প্রধান গ্রহীতা হয়ে ওঠায় বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে বেসরকারি খাত, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে।
বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে এবারের বাজেটের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে করছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একদিকে বাজেটে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমছে না। সরকার যদি এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত চাপে পড়বে। তারল্য সংকটও বাড়বে। এমনিতেই এখন সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে তারল্য সংকট দেখা দিলে ব্যাংক খাতে সুদহার আরো বেড়ে যাবে। ফলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।’
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের বাজেট ঘাটতি মডেলটি নিয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘ঘাটতি পূরণে বিদেশী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও তা পাওয়া যাবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। বিদেশীরা দেখে ব্যয়ের স্বচ্ছতা। আমরা যে পরিমাণ অর্থ নেই, তার পুরোটা খরচ করতে পারি না। বিভিন্ন কারণে বাস্তবায়নের দুর্বলতা থাকে। কেনাকাটা, প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। ফলে ঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়, তার পুরোটা পাওয়া যায় না। আবার পাইপলাইনে যা থাকে, তাও ঠিকমতো আসে না। গোটা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোয়ই ঋণের ফোকাস এখন বদলে গেছে। উন্নয়ন সহযোগীরাও অনেক শর্ত দিচ্ছে। সেগুলো পূরণ করতে হবে। আমাদের ক্রেডিট রেটিংয়েও ফোকাস দিতে হবে। ফিচ-এসঅ্যান্ডপির যে নেতিবাচক রেটিং এসেছে, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। সুতরাং, বাজেটে সরকারের যে ডেফিসিট মডেল, এটিকেই এখন পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদকৃত সরকারের মাসভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের স্থানীয় ঋণের মোট স্থিতি এরই মধ্যে ১১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২০ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার বেশিতে।
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ক্রমাগত হ্রাস পাওয়াকে সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, প্রায় চার অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ধারায়। অর্থাৎ যে পরিমাণে নতুন বিক্রি হচ্ছে, পুরনো ক্রেতাদের শুধু সঞ্চয়পত্রের আসল বাবদই অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির অংক ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে আসতে দেখা যায়। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অথচ ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্তও সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বাবদ আয়। ওই সময় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ সরকারের নিট আয় হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরিস্থিতির পুরোপুরি উল্টোচিত্র এর পরের অর্থবছর থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নতুন সরকারি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৮০ হাজার ৮৫৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার। আর সে বছর সঞ্চয়পত্র ভাঙার পর ক্রেতাদের শুধু আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৮৪ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। নিট বিক্রি নেমে আসে ঋণাত্মক ৩ হাজার ২৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকায়। পরের অর্থবছরে এ প্রবণতা বেশ বড় আকার ধারণ করে। সেবার ৭৮ হাজার ৮৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিক্রির বিপরীতে সঞ্চয়পত্রের আসল হিসেবে সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৯৯ হাজার ৯৭২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। নিট বিক্রি নেমে আসে ঋণাত্মক ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৪৩৯ কোটি ২০ লাখ বিক্রির বিপরীতে পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৪ হাজার ৫০২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকারি সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। এ সময় ৬৭ হাজার ৮৪৭ কোটি ৩২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির বিপরীতে আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৭০ হাজার ৫৩৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ নেয়া বাড়াতে হচ্ছে।
ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতা দেশের বেসরকারি খাতকে আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে বলে মনে করছেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকার বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহারও অতি উচ্চ। এ কারণে বেশির ভাগ ব্যাংক সরকারকে ঋণ দেয়াকে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করছে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতি শ্লথ। এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে না।’
সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক খাতে আমানতের সুদহার এখন বেশি। এ কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। আমানতের সুদ যদি সঞ্চয়পত্রের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে মানুষ কেন সঞ্চয়পত্র কিনবে? সরকারের উচিত ঋণের জন্য বিকল্প উৎসে যাওয়া। এক্ষেত্রে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ছাড়তে পারে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা পদ্মা সেতু যদি বন্ডের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থে বাস্তবায়ন হতো এবং সেটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকত, তাহলে দেশের পুঁজিবাজার প্রাণবন্ত হতো। আর ব্যাংক খাতের ওপরও সরকারের নির্ভরতা কমত।’