স্রোতের তীব্রতায় যমুনার তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে জেলার সদর, চৌহালী ও কাজিপুর উপজেলার শতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেললেও তা কাজে আসছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন প্রতিরোধে এখনো কার্যকর ও টেকসই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। এটি সমাধানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে ৭৮ কিলোমিটার যমুনা নদী বহমান রয়েছে। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর—এ পাঁচ উপজেলা যমুনা নদীর তীরবর্তী। এসব উপজেলায় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল রয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল কাজিপুর উপজেলার পলাশপুর ঘাট এলাকায় নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের দুটি স্থানের অংশ যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। এরপর ৮ জুন চৌহালী উপজেলার চর বিনানই ঘাট এলাকায় প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে ধসে পড়ে। সর্বশেষ ২০ জুন সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামে নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রাম, বড় কয়ড়া, রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা, চৌহালীর চর বিনানুই এবং কাজিপুরের পলাশপুর ঘাট এলাকায় ভাঙনের প্রকোপ রয়েছে।
কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ছোট একটি বসতঘর আমার একমাত্র সম্বল ছিল। গত ৪ জুন রাতে সেই শেষ আশ্রয়টুকুও যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।’
কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আল আমিন সরকার জানান, চরগিরিশ চরে একসময় প্রায় ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদী ভাঙনের কারণে ১৫০টি পরিবার আগেই অন্যত্র চলে গেছে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে। নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে আরো শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটি যেকোনো সময় বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, চরসলিমাবাদ, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১৫ দিনের ভাঙনে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা, বেসরকারি স্কুল ও দোকানপাটসহ অন্তত ৪০টি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে।
পাউবো ভাঙন রোধে নদীতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেললেও তা কোনো কাজে আসছে না। তবে নদীর তীরের বাসিন্দারা ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীর ও চরাঞ্চলের বসতিদের মধ্যে ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে। চরাঞ্চল ও নিম্ন অঞ্চলে পানি প্রবেশ করছে।
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুল আমিন জানান, ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে।
সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, নদীভাঙন রোধে চৌহালী উপজেলার একটি স্থানে ও সিরাজগঞ্জ সদরের বাহুকা এলাকায় কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ‘যমুনায় পানি বৃদ্ধি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও প্রবল স্রোত ও পানির নিচে ঘূর্ণিপাক থাকায় সিরাজগঞ্জ সদর, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অগ্রাধিকার ও জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকিয়ে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।’
ভাঙনের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে পাউবোর এ কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে চরাঞ্চলের ভাঙন রোধে জরিপ করে প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহীদুল হাসান বলেন, ‘এ এলাকায় নদীভাঙন নতুন কিছু নয়। শুধু জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্থায়ী তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এ জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’