বাংলাদেশে বাস্তবায়িত বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অপচয় হচ্ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের বদলে সরকারের সঙ্গে সরকারের সরাসরি চুক্তিতে প্রকল্প নেয়ায় ব্যয় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
‘বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্পের সুশাসন এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রভাব’ শীর্ষক এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। মাত্র ১৬ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ডলার আয়ের তুলনায় ঋণের দায় ১৯২ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ এখন নিম্ন ঝুঁকির অর্থনীতি থেকে মাঝারি ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে।
৪২টি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা যায়, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ না করে সরাসরি বা সরকার থেকে সরকার চুক্তিতে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রতিযোগিতার অভাব ও শর্তযুক্ত ঋণের কারণে একই প্রকল্পে চার গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয় দেখানো হচ্ছে।
এছাড়া ২৯টি মেগা প্রকল্পের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গড়ে প্রকল্পগুলোর ব্যয় বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি এবং বাস্তবায়নকাল দীর্ঘ হয়েছে গড়ে পাঁচ বছর। অতিমূল্যায়িত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো ধরে রাখতে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের তথ্য তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ বাড়লেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেয়া অর্থ বেড়েছে ১১ গুণ। এর মধ্যে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দেয়া ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বেড়েছে ২০ গুণ।
ভারতের আদানি গোড্ডা প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, এ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশকে ভারতের স্থানীয় গ্রিডের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এর ফলে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংকট উত্তরণে গবেষণায় সুপরিকল্পিত সুশাসন কাঠামোর ওপর জোর দেয়া হয়। প্রস্তাবনায় বলা হয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে গোপন ও দ্বিপাক্ষিক ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যয়বহুল চুক্তি পুনর্নির্ধারণ বা বাতিলের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়।
বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ প্রথা বাতিল করে প্রকৃত সরবরাহের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধ এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জ্বালানি তদারকি কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, দ্রুত সংস্কার না হলে মেগা প্রকল্পের ঋণের ভারে দেশের অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, জ্বালানি খাত অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণ ও উচ্চ ভর্তুকি আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মানুষের জীবনমান ও পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেন।
মুশতাক খান বলেন, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে সুশাসনের অভাব শ্রীলংকার মতো দেশকে সংকটে ফেলেছে। বাংলাদেশেও প্রভাবশালীদের যোগসাজশ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস প্যারে বলেন, ঋণ গ্রহণ যেন টেকসই উন্নয়নে রূপ নেয়, সে জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা জানান, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র চালু করায় সৌরবিদ্যুতের শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংস্কার জরুরি। এতে দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
অনুষ্ঠানে খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।