মাছের উদ্বৃত্ত জেলা সিরাজগঞ্জে ২৩ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে

চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জ মিঠা পানির মাছের একটি বড় উৎস।

চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জ মিঠা পানির মাছের একটি বড় উৎস। এখান থেকে প্রচুর মাছ সরবরাহ হয়; মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও, এটি মাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার, যা শুঁটকি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। জেলায় প্রতি বছর ২ হাজার ৩২৬ টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকছে। তবে অবৈধ জাল ব্যবহার, বিষটোপ প্রয়োগ, দূষণ এবং জলজ পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে দেশীয় প্রজাতির প্রায় ২৩ মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে বিলুপ্ত মাছের প্রজাতির সংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্য ও চিংড়িসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের স্থায়িত্বশীল উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে মৎস্য বিভাগ। উৎপাদন বাড়াতে মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ ও আভয়াশ্রমসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সিরাজগঞ্জেও প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় মাছ উদ্বৃত্ত থাকছে। সেগুলো জেলার বাইরে বিক্রি হচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় মাছের তালিকায় রয়েছে গুড়পুঁই, বাছা, ব্যাইটকা, গজার, ভেদা, শংকর, টিপপুঁটি, পানি রুই, মেনি, পুঁইয়া, চিতল, ফোলি, বেলে, দাঁড়কিনা, ঘাড়ুয়া, ভাংগন বাঁশপাতা, বৈরালী (বরালী) বালাচাটা, গুতুম (গোরকুন) ও খলিশা।

মৎস্যজীবীরা জানান, মাছের বংশবিস্তারের জন্য মৎস্য বিভাগ অধিক মনোযোগী না হওয়ায় নদী, খাল, বিল থেকে নির্বিচারে মাছ ধরা হচ্ছে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তারে হুমকির মধ্যে পড়েছে। নদীপাড়ের প্রতিটি ঘরে অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দোয়ারি জালের বিস্তার রোধ না করলে নদী ও জলাশয় থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ খুব শিগগির বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সিরাজগঞ্জ সরকারি রাশিদাজ্জোহা মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর আখতারুজ্জামান বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য সিরাজগঞ্জ বিখ্যাত ছিল। এখানে অবস্থিত নদী, খাল ও বিলে উৎপাদিত দেশীয় প্রজাতির মাছ একসময় কলকাতায় যেত। কিন্তু সেই মাছগুলো এখন আর চোখে পড়ে না। প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন থেকে ব্যবস্থা না নিলে দেশীয় প্রজাতির মাছ একসময় পুরোটাই হারিয়ে যাবে।’

জেলা মৎস্য অধিপ্তরের তথ্য বলছে, জেলায় প্রতি বছর মাছের চাহিদা রয়েছে ৭৩ হাজার ৫৩৩ টন। সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৭৫ হাজার ৮৫৯ টন। উদ্বৃত্ত থাকছে ২ হাজার ৩২৬ টন। মাছ উৎপাদনের প্রধান উৎস হচ্ছে ২১ হাজার ১১৯টি পুকুর, যা থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৩২ হাজার ৮৯১ টন। জেলার কিছু অঞ্চলে খাঁচায় মাছ চাষ করা হচ্ছে, যা থেকে বার্ষিক উৎপাদন ২ হাজার ৬৪৯ টন। এছাড়া উন্মুক্ত জলাশয়, বিল, নদী, প্লাবণভূমি থেকে ৭৬ হাজার টনের বেশি মাছ আহরণ করা হয়। জেলার মধ্যে রয়েছে ৮৫টি বিল, যমুনা, করতোয়া, হুরাসাগর, ইছামতি, ফুলজোড় বড়ালসহ ছোট-বড় আটটি নদী। এছাড়া রয়েছে বিশাল আয়তনের চলনবিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার ও বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানিতে মিশে পানি বিষাক্ত হচ্ছে। আবার বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য পানিতে মিশে পানি বিষাক্ত করছে। ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে। এছাড়া এক শ্রেণীর মৎস্যজীবী অবাধে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ শিকার করায় প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে মাছের আধারগুলোর মধ্যে অন্যতম সিরাজগঞ্জ। এখানকার নদী, খাল ও বিলের মাছ চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে। তবে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং অবাধে মাছ শিকারের কারণে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্তির পথে। প্রজাতি রক্ষায় মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোয় ১৪টি অভয়াশ্রম করা হয়েছে। অভয়াশ্রম থেকে কেউ যেন মাছ শিকার না করে সেজন্য কঠোর নজরদারিও করা হচ্ছে।’

আরও