দাম পড়ে যাওয়ায় এবার আলু চাষে অনাগ্রহ

উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমাল কৃষি অধিদপ্তর, বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার শঙ্কা

রংপুরে পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামের কৃষক মোকসেদুল ইসলাম। গত মৌসুমে ১২ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ ও জমি বন্ধকের টাকা দিয়ে ৩০ একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন।

রংপুরে পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামের কৃষক মোকসেদুল ইসলাম। গত মৌসুমে ১২ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ ও জমি বন্ধকের টাকা দিয়ে ৩০ একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আশা ছিল ঋণ শোধ করেও লাভ থাকবে তার। তবে শেষ পর্যন্ত লাভ তো দূরে থাক খরচই ওঠাতে পারেননি। মাত্র ৭ লাখ টাকার আলু বিক্রি করেছেন মোকসেদুল। গত মৌসুমের লোকসানের কারণে এবার ২০ একর জমিতে আলু চাষ করবেন তিনি। শুধু মোকসেদুলই নন, গত বছর লোকসানে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকই এবার আলু চাষ কমিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পর্যালোচনাও বলছে, গত মৌসুমের তুলনায় এ মৌসুমে আলুর চাষ কম হবে। সেজন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত আলুর চেয়েও চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগের বছর যতটুকু উৎপাদন হয় পরের বছর তার চেয়ে বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।

লক্ষ্যমাত্রা কমানো সত্ত্বেও তা অর্জন হবে কিনা, এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কৃষি কর্মকর্তাদের। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেও রাজধানী ঢাকায় খুচরা পর্যায়ে ২০ থেকে ২৫ টাকায় আলু কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। কোনো পণ্যের দাম কমলে সবসময়ই ওই পণ্যের চাষ কম হয়। এদিকে চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন কম হলে আগামীতে দেশের আলু বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। এজন্য তারা হিমাগারে আলু সংরক্ষণ খরচ কমানো ও বাফার স্টকের পরামর্শও দিয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। উৎপাদন হয় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬০০ টন। গত অর্থবছরে চাষ হওয়া জমির তুলনায় এবার ২৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭০০ টন। যদিও এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কেননা, গত বছর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ২৩ দশমিক ৩৯ টন। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন প্রায় এক টন বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ দশমিক ৩৪ টন। যেটিকে অসম্ভব বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় উত্তরের দুই বিভাগ রংপুর ও রাজশাহীতে। গত বছর এ দুই বিভাগে আলু উৎপাদন হয়েছে ৮৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৮৮ টন। অর্থাৎ জাতীয় উৎপাদনের ৭৬ শতাংশই অবদান ছিল রংপুর-রাজশাহী বিভাগের। গত বছর এ দুই বিভাগের ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪১ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ দুই বিভাগে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৩৩ হাজার ৭৬১ হেক্টর কম নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশের কৃষির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের ক্রপস উইং। লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণের বিষয়ে ক্রপস উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. হজরত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো পণ্যের দাম কম হলে পরেরবার স্বাভাবিকভাবেই সে পণ্যের চাষ কম হয়। আর দাম বেশি থাকলে চাষ তথা উৎপাদন বেশি হয়। গতবার আলুর দাম কম থাকায় কৃষক লোকসানে পড়েছে। তাদের উৎপাদিত খরচের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও এখনো রাজধানী ঢাকাতেই খুচরা বাজারে ২০-২৫ টাকায় আলু কেনা যাচ্ছে। এত কম দাম হওয়ায় কৃষক এবার আলুর আবাদ কম করবেন বলেই আমরা ধারণা করছি। সেজন্য গত বছর যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়েছে তার চেয়েও এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কম ধরা হয়েছে।’

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৯০ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে ৮০ লাখ টনের বেশি আলু ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়। আর ৭ থেকে ৮ লাখ টন আলু বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের (টিআরসি) পরিচালক ড. মো. মতিয়ার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে বার্ষিক আলুর চাহিদা ৭৬ লাখ টনের মতো। চিপসসহ কিছু খাবার পণ্য তৈরিতেও আলু ব্যবহৃত হয়। সেগুলোর সঠিক তথ্য আমাদের কাছে থাকে না। এছাড়া বীজ হিসেবে সাত-আট লাখ টন আলু ব্যবহার হয়। গতবার চাহিদার তুলনায় আলু উদ্বৃত্ত ছিল। সেজন্য কৃষককে লোকসান গুনতে হয়েছে। সেজন্য এবার কৃষকরা আলু কম চাষ করবেন বলেই ধরে নেয়া যায়।’

কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে কত ব্যয় হয় সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সরকারি সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা। বেসরকারি হিসাবে সেটি ১৭ টাকার মতো। উৎপাদিত সেসব আলু হিমাগার গেটে (পাইকারি) ১২ থেকে ১৩ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে। অথচ হিমাগার ভাড়ার সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয় যুক্ত করে প্রতি কেজি আলুতে কৃষকের খরচই ২৫ টাকার কাছাকাছি। এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে প্রতি কেজি আলুতে কৃষকের ন্যূনতম লোকসান ১০ টাকা। যদিও জমি থেকে আলু তোলার পর আরো কম দামে আলু বিক্রি করতে হয়েছে কৃষকদের। তবে চলতি বছর আলু উৎপাদনে কত ব্যয় হবে সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টন। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন। এর আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ টন। গত নভেম্বরে খুচরায় আলুর দাম সর্বোচ্চ ৭০ টাকায় উঠেছিল। এরপর দেশে রেকর্ড পরিমাণ আলুর চাষ হয়।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দামে গত বছর ধস নামে। এরপর হিমাগারের খরচ বাড়িয়ে দেয় হিমাগার মালিক সমিতি। ফলে আলু সংরক্ষণ করার চেয়ে বাজারে ছেড়ে দেন কৃষকরা। আলুর মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের নিচে নেমে আসার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা সে সময় আকস্মিকভাবে হিমাগারের ভাড়া বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করেছিলেন। তাদের ভাষ্য আগের মৌসুমে আলুর ভালো দাম পাওয়ায় দেশে আলুর আবাদ বেড়ে যায়। উৎপাদন বাড়ায় আলুর দাম কমে যায়।

গতবার লোকসানে পড়ায় এবার আলু চাষ থেকে অনেক কৃষকই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে আগামী আবার আলুর বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর সরকার ম্যানেজমেন্টে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের ভুল ম্যানেজমেন্টের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার যদি ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিত তাহলে কৃষক বেঁচে যেত। আবার তারা বাফার স্টক করতে পারত। এরপর সেগুলো টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে নাগরিকের কাছে বিক্রি করলে বাজার ধস ঠেকানো যেত। বাজার রক্ষার্থে সরকার ৫০ হাজার টন আলু কিনেছে। যেটি মোট উৎপাদনের ১ শতাংশের অর্ধেকও না। এটি এক ধরনের তামাশা করার মতো। তারা যদি ১০-১৫ লাখ টন আলু কিনে সংরক্ষণ করত তাহলে কৃষককে হাহাকার করতে হতো না। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার হিমাগার গেটে আলুর ন্যূনতম মূল্য ২২ টাকা প্রতি কেজি নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সেটিও মানা হচ্ছে না। খুচরা বাজারেই ২০ টাকা কেজিতে আলু কেনা যাচ্ছে। এখানে সরকারের ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত বছরের উৎপাদিত আলু দেশে উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে। রফতানি হয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার টন। বীজ হিসেবে ব্যবহারের পর অন্তত ১০ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকবে। এটা বাস্তব যে গতবারের লোকসানের কারণে এবার চাষ ও উৎপাদন কমবে। গতবারের উদ্বৃত্ত থাকায় এবার উৎপাদন কিছুটা কমলেও তেমন প্রভাব পড়বে না। তবে ব্যাপকভাবে উৎপাদন কমে গেলে সেটির প্রভাব বাজারে পড়বে ও অস্থিতিশীল হবে। তবে অস্থিতিশীল হওয়ার মতো এতটা কম চাষ হবে বলে মনে করছি না।’

আরও