উজানের ঢলে ফের ডুবছে ফেনীর নিম্নাঞ্চল, বাড়ছে তিন নদীর পানি

ভারতের ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। উজানের ঢলে বাড়তে শুরু করেছে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি।

ভারতের ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। উজানের ঢলে বাড়তে শুরু করেছে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একাধিক ভাঙন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে আবারো নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকালে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ৮ জুলাই থেকে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় তিনটি নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪১টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এর মধ্যে ছয়টি স্থানে মেরামতকাজ শেষ হয়েছে। ২৮টি স্থানে কাজ চলমান রয়েছে। ভারতের ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে রোববার রাতে নদীর পানি আবারো দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে। এতে একাধিক ভাঙন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম বণিক বার্তাকে বলেন, উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে ফেনীর তিনটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বেলা ১টার দিকে মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১২ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। খুব দ্রুত পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে। এতে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ভয়াবহ বন্যায়ও মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের শতাধিক স্থান ভেঙেছিল। পরে ২০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দে বাঁধগুলো মেরামত করা হলেও বছর না পেরোতে আবারো ভেঙেছে। বাঁধের এসব ভাঙা স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। গতকাল সকালে পরশুরামের পশ্চিম অলকা, পূর্ব অলকা, নোয়াপুর, চিথলিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ও ফুলগাজীর কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাউবোর তদারকির অভাবে বাঁধ ভেঙে প্রতি বছর এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।

পরশুরামের পশ্চিম অলকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে তেমন বৃষ্টি না হলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এজন্য কয়েকদিন আগে বাঁধের যেসব স্থান ভেঙেছে তা দিয়ে নতুন করে পানি ঢুকছে। আমাদের এ দুর্ভোগ কখনো কাটবে না।’

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, ফেনীতে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নয় মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে বৃষ্টি না হলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এজন্য নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।

জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ৭ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১ স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এতে প্লাবিত হয় একের পর এক জনপদ। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। প্লাবিত হয় ছাগলনাইয়া, সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার ১১৪টি গ্রাম। বন্যার পানিতে জেলার ১২৬টি সড়কের প্রায় ৩০০ কিলোমিটারে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। খামারে পানি ওঠায় অন্তত ১৫-১৭ হাজার হাঁস-মুরগি মারা গেছে। অন্তত আড়াই হাজার পুকুর থেকে ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় ফেনীর সব উপজেলার ফসলি জমি কম-বেশি আক্রান্ত হয়েছে। শুধু কৃষিতেই অন্তত ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন বীজতলার। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৩২২ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেন কৃষক। এর মধ্যে ৬৯৪ হেক্টর বীজতলা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে ১৯৭ হেক্টর বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ৪৯৭ হেক্টর বীজতলার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষকের অন্তত ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৫৫৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি। এর মধ্যে ৩২৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ২৩০ হেক্টর জমির সবজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৪৬ হেক্টর জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় গ্রীষ্মকালীন মরিচ, হলুদ, টমেটো, আদাখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে ফেনীতে বয়ে যাওয়া বন্যায় পানির চাপে ৫০টি বসতঘর ভেসে গেছে। এছাড়া রাস্তাঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বিদ্যুৎ বিভাগসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতি হয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলায় অন্তত ২৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর সব উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এতে ২৯ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। পানিবন্দি হয়ে পড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। বন্যায় প্রায় ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছিল।

আরও