গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে মোট কারাগার রয়েছে চারটি। তার একটি দেশের প্রথম ও বিশেষায়িত নারী কারাগার। দ্বিতীয়টির অবস্থান কেরানীগঞ্জে। যদিও সেটি চালু হয়নি এখনো। তাই ‘কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার’টিতে বর্তমানে স্থান সংকুলানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। সে হিসাবে একজনের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় থাকতে হচ্ছে দুজনকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনজনকেও ছোট্ট একটি জায়গা ভাগ করতে হয়। সে কারণে অনেকেই ভুগছেন চর্মজনিতসহ নানা রোগ-শোকে। অন্য বন্দিদের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৬ আগস্ট। এর ধারণক্ষমতা ২০০ জন। সেখানে এখন বন্দি রয়েছেন সাড়ে চারশ নারী। এছাড়া দেশের জেলা পর্যায়ের কারাগারের নারী সেলে মোট বন্দি ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৯২৯ জন। এর বিপরীতে ২ হাজার ৯৮১ নারী বন্দি রয়েছেন।
এদিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের জন্য একটি অনুমোদিত পদ থাকলেও কোনো চিকিৎসক নেই। তবে চাহিদা অনুযায়ী সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে নিয়মিত চিকিৎসক আসেন বলে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। এরপর জরুরি প্রয়োজন হলে কারাগারে চিকিৎসক নিয়ে আসা হয়।
সুরাইয়া বেগম (ছদ্মনাম) বন্দি ছিলেন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে। সম্প্রতি তিনি কারামুক্ত হয়েছেন। তার সঙ্গে কথা বলে নিজের বন্দিজীবন নিয়ে বণিক বার্তাকে জানান, কারাগারটিতে ধারণক্ষমতার দুই-তিন গুণ নারী বন্দি রাখা হয়। সীমিত স্থানের মধ্যেই থাকতে হয় তাদের। অনেককে দুজনের জায়গায় পাঁচ-ছয় বন্দিকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। পাশাপাশি কারাগারটিতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা ইস্যুতেও রয়েছে অনেক ঘাটতি। অপরিচ্ছন্ন বিছানা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকায় অনেক বন্দিই নানা ধরনের চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জিতে ভোগেন। প্রয়োজন মতো চিকিৎসাসেবাও পাওয়া যায় না।
স্থান সংকুলানের ঘাটতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অবস্থানের ফলে বন্দিদের নানা ধরনের ব্যাধির শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এ বিষয়ে চর্ম, যৌন, অ্যালার্জি ও হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডা. মো. কামরুল হাসান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাদাগাদি করে থাকায় অনেক ধরনের স্কিন ডিজিজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। স্কিনের সমস্যাগুলো বেশির ভাগই ছোঁয়াচে। ফলে অতিরিক্ত গরমে এবং সক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ এক জায়গায় থাকলে এসব রোগ একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সমান নয়। যার কারণে অনেকেই খুব কম সময়ের মধ্যে সংক্রমিত হয়।’
এদিকে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নারী বন্দিদের জন্য ‘মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার’ উদ্বোধন করা হলেও লোকবল সংকটের কারণে এখনো সেটি চালু হয়নি। উদ্বোধনকালে বলা হয়েছিল, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নারী বন্দিদের এ কারাগারে রাখা হবে। সেখানে কিশোরী বন্দিদের জন্য রয়েছে আলাদা ভবন। আর যে বন্দিদের সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য রাখা হয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার। এছাড়া হাসপাতাল, বিদ্যালয়, পাঠাগার, ওয়াশিং প্লান্ট ও মানসিকভাবে অসুস্থ বন্দিদের জন্যও আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এতসব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নির্মাণের পাঁচ বছরেও কারাগারটিকে সচল করা সম্ভব হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত নারীদের একমাত্র কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে কাশিমপুরই ঠিকানা।
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত নারী বন্দি থাকায় কারাগারটিতে স্থান সংকুলান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালও স্বীকার করেছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে স্থান সংকুলানের চ্যালেঞ্জ আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি স্যানিটেশন ও হাইজিন মেইনটেইনের ক্ষেত্রেও কিছুটা কম্প্রমাইজ করতে হচ্ছে। তবে খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কোনো সংকট নেই। পাশাপাশি নারী বন্দিদের যথেষ্ট সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব থাকায় ধারণক্ষমতার অধিক বন্দি নিয়েও খুব একটা সমস্যা হয় না। তবে সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে গেলে কিছু বন্দিকে জেলা কারাগারের নারী সেলে স্থানান্তর করা হয়। পরে আবার সুবিধামতো সময়ে তাদের কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।’