কোথাও কোথাও এত ঘন কচুরিপানা জমেছে যে পানির অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। এতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কমছে নাব্যতা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্য এবং বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। অথচ কচুরিপানা অপসারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কোনো আলাদা বাজেট নেই।
জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা, কুমার, চিত্রা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেগবতী, কালীগঙ্গা, কোদলা, গড়াই, ডাকুয়া, বেতনাসহ ১২টি নদ-নদীর বিভিন্ন অংশ বর্তমানে কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নদীগুলো স্বাভাবিক প্রবাহ ও গভীরতা হারাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা মাসের পর মাস নদীতে জমে থাকে। নিয়মিত অপসারণ না হওয়ায় কচুরিপানার নিচে পলি জমে নাব্যতা কমছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে। নদীর পানি স্থির হয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক এলাকায় বেড়েছে মশার উপদ্রব।
কালীগঞ্জ উপজেলার তৈলকুপী গ্রামের বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, ‘আগে সারা বছর নদীতে ডোঙা চলত। এখন কচুরিপানায় নদী এমনভাবে ঢেকে থাকে যে অনেক সময় পানিই দেখা যায় না। বর্ষায় পানি নামতে দেরি হয়, ফলে আশপাশের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।’
নদীতে কচুরিপানা জমে থাকায় সেচের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শৈলকুপার কৃষক রেজাউল ইসলাম। তিনি জানান, অনেক খাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে কৃষিকাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মৎস্যজীবীরা। ভৈরব নদীর জেলে আব্দুস সামাদ বলেন, ‘আগে জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ অনেক কমে গেছে। কচুরিপানার কারণে জাল ফেলতে সমস্যা হয়, অনেক সময় জাল ছিঁড়েও যায়।’
আরেক জেলে বিপুল হোসেন বলেন, ‘কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছতে পারে না। এতে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হয়।’
তবে স্থানীয় নদ-নদীর কচুরিপানা অপসারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বাজেট নেই বলে জানালেন ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস। তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় স্থানে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করি। মাছের ক্ষতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের আওতাভুক্ত।’
কচুরিপানা অপসারণসংক্রান্ত বিষয়ে একই অভিমত জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মুন্তাসির রহমান জানান, এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সরকারি কর্মসূচি বা নির্দেশনা নেই।
সরকারি বরাদ্দের অভাবে অপারগতার কথা জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শিল। তিনি বলেন, ‘কচুরিপানার কারণে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র হুমকির মুখে পড়ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’