জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে পৃথক করার উদ্যোগ নেয় সরকার। তার জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটি বেশকিছু সুপারিশও করে। কিন্তু সেগুলো আমলে না নিয়েই তৈরি খসড়া অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন পায়। খসড়াটি অনলাইনে প্রকাশ হলে তা দেখে আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশন গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে তাদের ক্ষোভ ও বাতিলের দাবি জানিয়েছে। ট্যাকসেশন অ্যাসোসিয়েশন গতকাল বিশেষ সাধারণ সভা করেছে। তারাও অনুমোদিত খসড়া অধ্যাদেশ বাতিল চান।
এনবিআর সংস্কারে গঠিত পরামর্শক কমিটির সুপারিশে বলা হয়, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন করে রাজস্ব আহরণের কার্যক্রমকে পৃথক করা হবে। নীতি প্রণয়নের কাজটি রাজস্ব কমিশন নামে একটি স্বাধীন সংস্থার ওপর ন্যস্ত থাকবে। সংস্থাটিকে দেয়া হবে বিভাগ মর্যাদা। আর নীতি বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায়ের কাজটি এখনকার মতোই পুনর্গঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করবে। সেই সঙ্গে বর্তমান কাঠামো পুনর্গঠন করে আয়কর শাখা এবং শুল্ক ও ভ্যাট শাখার সমন্বয়ে বোর্ডকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বতন্ত্র বিভাগের মর্যাদায় উন্নীত করা হবে। আয়কর বিভাগ এবং শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে কর্মরত সদস্য থেকেই নিয়োগ করা হবে বোর্ড চেয়ারম্যান, যারা পাবেন সচিব বা সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা। চেয়ারম্যান সরাসরি অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করবেন। কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনও বোর্ড করবে।
রাজস্ব কমিশনেও আয়কর বিভাগ এবং শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে কর্মরতদের থেকেই সচিব বা সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় প্রধান নিয়োগ করা হবে। আর কমিশনে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, ট্যারিফ কমিশনের যথোপযুক্ত প্রতিনিধি; প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ; কর ও রাজস্ব (ফিসক্যাল) বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি; ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং চিন্তক (থিংক ট্যাংক) ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি স্থায়ী উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। তারা তিন মাস পর পর রাজস্ব কমিশনকে নিয়মিত পরামর্শ দেবে।
অনুমোদিত খসড়া অধ্যাদেশে যদিও রাজস্ব কমিশন ও রাজস্ব বোর্ডের পরিবর্তে দুটি বিভাগ (রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা) করার কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও পরামর্শক কমিটির কোনো সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরামর্শক কমিটির প্রধান এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ও কমিটির অন্য সদস্যরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এভাবে যে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে তা ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না বলে অনুমান করা যায়। এতে সংস্কার হবে না, শুধু গোলমাল সৃষ্টি হবে। নীতি বিভাগ এবং বাস্তবায়ন বিভাগ দুটি পরস্পরবিরোধী সংস্থা তৈরি হবে। ফলে রাজস্ব আদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজকে এক সময় দুই ভাগ করা হয়েছিল। এক বছর পর আবার একীভূত করতে হয়েছে।’
এদিকে এনবিআরকে পৃথক করার ক্ষেত্রে সংস্থাটির কর্মকর্তারা যেসব মতামত রাজস্ব সংস্কারের পরামর্শক কমিটিকে দিয়েছিলেন, তার প্রতিফলন খসড়া অধ্যাদেশে দেখা যায়নি বলে দাবি করেন দুই ক্যাডারের কর্মকর্তারা। সিভিল সার্ভিস (ট্যাকসেশন) অ্যাসোসিয়েশন গতকাল বিশেষ সাধারণ সভা করে অধ্যাদেশের খসড়া বাতিলের পাশাপাশি এনবিআর বিলুপ্ত না করা এবং অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের আলোচনার দাবি জানান। সভায় আয়কর ক্যাডারের সব ব্যাচ থেকে একজন কর্মকর্তা তাদের ব্যাচের পক্ষ থেকে দাবি ও তার সপক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
সভায় বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে আমাদের কথা হয়। তাদের বলা হয়েছিল, এনবিআরের সার্বিক সংস্কার দরকার। মডেল হিসেবে আমরা যুক্তরাজ্যের মডেলের কথা বলেছিলাম। তারপর গত ৯ অক্টোবর এনবিআর সংস্কার পরামর্শক কমিটি গঠন করা হলো। তাদের সঙ্গে শুধু পলিসি নয়, সার্বিক সংস্কারের কথাই বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও নিউজিল্যান্ডে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পলিসি ও প্রশাসন একসঙ্গে। এটা আমরা বিশ্বব্যাংককে বোঝালাম। বিশ্বব্যাংক এ মডেলে রাজি হলো। এনবিআর সংস্কার পরামর্শক কমিটিও আমাদের মডেলেই সুপারিশ দিয়েছিল। কিন্তু খসড়া অধ্যাদেশ হলো দুটি বিভাগ মডেলে। বিভাগ মডেলে গেলে তো আমরা অনেক কিছু হারাব। এখানে আমাদের কর ও কাস্টমস ক্যাডার থেকে সচিব হওয়া সম্ভব নয়। এটা রুলস অব বিজনেস অনুযায়ীই সম্ভব নয়।
এ সভায় আরো বলা হয়, পলিসির কাজে সীমারেখা টানার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ জানুয়ারি দুই অ্যাসোসিয়েশন থেকে একত্রে উপদেষ্টার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেখানে এনবিআরকে বিভাগের মর্যাদায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়। এনবিআরের দুটি ক্যাডারের সব প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও এনবিআরই করবে। এনবিআরের চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিবের মর্যাদার হবেন, তিনি সরাসরি অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করবেন। পলিসি উইং আলাদা হবে এবং থিংক ট্যাংকের আদলে। এখানে কোনো ব্যুরোক্র্যাসি থাকবে না। এ পলিসি নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ থাকবে না। পরামর্শক কমিটি আমাদের জানাল এ মডেলের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টার কোনো আপত্তি নেই। ১৪ জানুয়ারি দুই অ্যাসোসিয়েশন মিলে একটা সামারি তৈরি করা হয়। এটা অর্গানোগ্রামসহ উপদেষ্টার কাছে যাবে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনাকালে মনে হলো এটার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ রাজি নয়। তখনই আমরা বুঝলাম, এনবিআর থাকবে না। ৬ মার্চ একটা খসড়া পেলাম, যেটা উপদেষ্টার কাছে গেছে। সেখানে ছিল বিভাগ মডেলে, অর্থাৎ দুটি বিভাগেই দুই ক্যাডার থেকে সহকারী সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত সব পদে নিয়োগ পাবে। কিন্তু ১১ মার্চ আরেকটি খসড়া গেল। সে খসড়াতে দুটি বিভাগেই কর ও কাস্টমস ক্যাডারের পদ থেকে সব পদ পূরণের শর্তটি কেটে দেয়া হলো। তার মানে এ মডেলে গেলে আমরা এনবিআর হারাচ্ছি। বিভাগে যদি ১০টি শাখা থাকে, সেখানে চারটি হবে কর ও কাস্টমস ক্যাডারের। বাকিগুলো প্রশাসন ক্যাডারের। ১১ মার্চ যে খসড়া বদলে গেল, এটা আমাদের জানার অধিকার ছিল।
সভায় বক্তারা আরো বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী বিভাগ কখনো এনফোর্সমেন্ট করতে পারে না। এটা করতে পারে এজেন্সি। আমরা ব্যাংক সার্চ দিই, এভিডেন্স জব্দ করি, গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া আছে আমাদের। পৃথিবীর কোনো দেশে রাজস্ব এজেন্সির ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও হয় না। পৃথিবীর কোনো দেশেই রাজস্ব এজেন্সি বিভাগের মর্যাদায় থাকে না।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনুমোদিত খসড়া অধ্যাদেশ বিষয়ে আমাদের কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। আমরা আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরব। রোববার (আজ) আমরা দুই অ্যাসোসিয়েশন বসে আলোচনা করব।’
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পূর্ণ অবহিত আছেন। আশা করি বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সকল অংশীজনের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য করে অধ্যাদেশটিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।