ভোগ কমেছে চালের, বেড়েছে মাছ-মাংস ও ভোজ্যতেলের

কৃষিভিত্তিক সমাজে কায়িক শ্রমের প্রাধান্য থাকায় প্রাচীনকাল থেকে ভাতই এ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য। মানুষের শ্রমের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হতো ডাল-ভাত জোগাড়ের পেছনে। কিন্তু কালের বিবর্তনে পরিবর্তন এসেছে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর্থিক সংগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তার আচরণেও এসেছে পরিবর্তন। কমে এসেছে চাল-ডাল ভোগের পরিমাণ। অন্যদিকে মাছ-মাংস-ডিম, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও ফলের ভোগ বাড়ছে।

কৃষিভিত্তিক সমাজে কায়িক শ্রমের প্রাধান্য থাকায় প্রাচীনকাল থেকে ভাতই এ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য। মানুষের শ্রমের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হতো ডাল-ভাত জোগাড়ের পেছনে। কিন্তু কালের বিবর্তনে পরিবর্তন এসেছে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর্থিক সংগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তার আচরণেও এসেছে পরিবর্তন। কমে এসেছে চাল-ডাল ভোগের পরিমাণ। অন্যদিকে মাছ-মাংস-ডিম, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও ফলের ভোগ বাড়ছে।

দেড় দশকের ব্যবধানে যেসব শস্য ও প্রাণিজ পণ্যের দৈনিক জনপ্রতি ভোগের পরিমাণ বেড়েছে তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ডিম, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও মাংস। এর মধ্যে ডিমের ভোগ বেড়েছে আড়াইগুণের বেশি। অন্যদিকে ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের ভোগ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। যদিও এ সময়ে চাল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য এবং ডালের ভোগ কমে গেছে।

গত দেড় দশকের ভোগপ্রবণতা বিশ্লেষণের পাশাপাশি আগামী এক দশকে ভোক্তাদের চাহিদায় যে ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটি বলছে, আগামী এক দশকে যে চারটি পণ্যের জনপ্রতি ভোগ সবচেয়ে বেশি বাড়বে তা হচ্ছে ডিম, ফল, মাংস ও মাছ। এ সময় ডিমের চাহিদা বাড়বে প্রায় ৭১ শতাংশ। আর ফল ও মাছের চাহিদা বাড়বে ৬০ শতাংশের বেশি। তবে গত দেড় দশকে ডালের ভোগ কমলেও আগামী দশকে পণ্যটি চাহিদা প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য পর্যালোচনা করে বিশ্বব্যাংক দেখিয়েছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ডিমের ভোগ বেড়েছে প্রায় ১৬০ শতাংশ। অন্যদিকে ভোজ্যতেলের ১১৫ শতাংশ, পেঁয়াজের ১০৫, মাংসের ৮৫, মাছের ৬৫, ফলের ২৫, সবজির ২০ ও গমের ১৫ শতাংশ ভোগ বেড়েছে। একই সময়ে চালের চাহিদা কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা ১০ এবং ডালজাতীয় পণ্যের চাহিদা ৩ শতাংশ কমেছে।

আবার আগামী এক দশকে যে কয়টি শস্য ও প্রাণিজ পণ্যের জনপ্রতি দৈনিক চাহিদা ক্রমবর্ধমানহারে বৃদ্ধি পাবে তার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে ডিম, ফল, মাংস ও মাছ। এছাড়া সবজি, আলু, দুধ ও ডালের চাহিদাও তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে প্রাণিজ পণ্যের চাহিদায় বড় পরিবর্তন আসবে। ডিমের চাহিদা ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৭১ শতাংশ বাড়বে। অন্যদিকে মাংসের চাহিদা ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩৮ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৬১ শতাংশ বাড়বে। দুধের চাহিদা ২০২৫ সালে ১৬ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। দেশের মানুষের আর্থিক সংগতির পরিবর্তন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণেই ভোগে এ ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মানুষের একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার পর যদি জনপ্রতি আয় বৃদ্ধি পায়, তাহলে প্রায় আয়ের সমান শতাংশ হারেই প্রোটিন জাতীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি শর্করাজাতীয় পণ্যের চাহিদা কমে আসে। গত কয়েক বছর ধরে মাথাপিছু আয় প্রায় ৭-৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ হার যদি বিদ্যমান থাকে, তাহলে আগামী ১০ বছরে প্রোটিন জাতীয় পণ্যের চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। সামনের দিনে দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সহায়ক এখন প্রাণিসম্পদ খাত। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং সুষম খাবার গ্রহণে আগ্রহের কারণেই মানুষ মাংস, দুধ ও ডিমের প্রতি ঝুঁকছে। সামনের দিনে মানুষ প্রক্রিয়াজাত প্রোটিন পণ্যই বেশি গ্রহণ করবে। পণ্যের উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি তা প্রক্রিয়াজাত করে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছতে যথাযথ বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, সামনের বছরগুলোয় শস্য খাতের নানা পণ্যের ক্ষেত্রেও চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর মধ্যে ফলের চাহিদা ২০২৫ সালে ৪৬ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। এ সময়ে সবজির চাহিদা ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ শতাংশে এবং আলুর চাহিদা ২২ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত হবে। পাশাপাশি ডালের চাহিদা ২০২৫ সালে বাড়বে ৫ শতাংশ, যা ২০৩০ সালে ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। তবে চালের চাহিদা আরো কমবে। ২০২৫ সালে ৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে প্রধান খাদ্যশস্যটির চাহিদা।

শস্য খাতের এসব পণ্যের চাহিদার ব্যাপক পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়েই সামনের দিকে উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক সময়ে শস্য খাতের উৎপাদনে বহুমুখীকরণ শুরু হয়েছে। সেটিকে আরো বৃদ্ধি করতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া দরকার বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সব পণ্য একই সঙ্গে উৎপাদনের প্রয়োজন নেই। কৃষকের কাছে জোর করে কোনো পণ্য উৎপাদন বাড়াতে গেলে হিতে বিপরীতে হবে। সেজন্য ভোক্তা চাহিদার পাশাপাশি যেসব পণ্য তুলনামূলক বাড়তি সুবিধা দেবে, সেসব পণ্য উৎপাদনে বেশি নজর দিতে হবে। যেমন-ডালজাতীয় শস্যের মধ্যে অড়হড় বা ফেলন বা এ-জাতীয় পণ্য উৎপাদনে জোর না দিয়ে শুধু মসুর বা ছোলা আবাদে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। শস্যের উৎপাদনের তুলনামূলক সুবিধা বিশ্লেষণ, ভূ-প্রাকৃতিক গঠন, বাজার দর, আবহাওয়া উপযোগিতা ও মাটির কার্যকারিতা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলেই সব ভোক্তা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। আবার কৃষকের সম্পদশালী করাও সম্ভব হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগিসহ সব ধরনের প্রাণীর উৎপাদন হয়েছে ৪১ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৪০ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার। দেশের খামারিরা প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছে। পাশাপাশি মুরগির উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ২৭ কোটি টন। এছাড়া গত অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৭ লাখ টন। অন্যদিকে মাংসের উৎপাদন ছিল প্রায় ৭৭ লাখ টন। চাহিদার সমান ডিম ও মাংসের উৎপাদন হলেও দুধের ঘাটতি রয়েছে। সামনের দিনে ভোক্তা চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানান প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গত কয়েক দশকে পুষ্টিকর খাবারের অন্যতম উৎস হিসেবে দুধ, ডিম ও মাংসের চাহিদা বেড়েছে। সামনের দিনে এসব পণ্যের চাহিদা আরো বাড়বে বলেই আমরা ধারণা করছি। চাহিদার দিকটি বিবেচনায় নিয়েই আমরা উৎপাদন বাড়ানোর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। এক সময় দুধ ও মাংসের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে অনেক ব্যবধান ছিল। সেটি অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে যুব কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের গতিশীলতা আসছে। এ খাতের উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি খাতকে আরো যুক্ত করা, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে এগিয়ে আসা, উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং অর্থায়ন বাধা দূর করতে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশের খামারগুলোর মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত করার মাধ্যমে প্রাণিজ পণ্যের রফতানি বাজারেও আমরা প্রবেশ করতে পদক্ষেপ নিচ্ছি।

গত দেড় দশকে দেশে মাছের উৎপাদনও বেড়েছে বেশ। সেই সঙ্গে বেড়েছে ভোগের পরিমাণও। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মাছের চাহিদা প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোগের এ পরিবর্তন আগামী এক দশক চলমান থাকবে। মাছের চাহিদা ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। যদিও ২০৩০ সালে তা ৫৬ শতাংশে উন্নীত হবে। গত অর্থবছরে মাছের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ টন।

দেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি মূলত এ চাহিদা ও ভোগের পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মত্স্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে দেশের একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৩ গ্রাম মাছ গ্রহণ করছে। দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। মূলত ভোক্তা চাহিদার ওপর ভর করেই ২০৩০ সালের মধ্যে জনপ্রতি ভোগ ৬৮ গ্রামে উন্নীত হতে পারে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন ছাড়াবে ৫০ লাখ টন।

তবে মাছ উৎপাদন প্রক্রিয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনই নজর দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের প্রধান খাবার এখনো পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও সিলভার কার্পজাতীয় মাছ। এগুলোর খামারি পর্যায়ের দাম ও ভোক্তা দাম প্রায় সমান সমান হয়ে গেছে। এখানে এসব মাছের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। তা না হলে সামনের দিনে উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তখন ভোগের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

আরও