প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

মাভাবিপ্রবিতে কেনার কয়েক মাসেই অকেজো যন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম

প্রকল্পের সভায় উপস্থিত না থেকেও সম্মানীর অর্থ তুলে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা। তাদের যোগসাজশেই প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কেনার কয়েক মাসের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে এসব যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ। আইনবহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে প্রকল্প খাতে।

প্রকল্পের সভায় উপস্থিত না থেকেও সম্মানীর অর্থ তুলে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা। তাদের যোগসাজশেই প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কেনার কয়েক মাসের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে এসব যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ। আইনবহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে প্রকল্প খাতে। এমনকি প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকেও (ইউজিসি)

এমন নানা অনিয়ম অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পকে ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনিয়মগুলো সংঘটিত হয়েছে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই।

২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর একনেকে ৩৪৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। প্রকল্পটি জুলাই ২০১৬ থেকে ৩০ জুন ২০১৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। পরবর্তী (আরডিপিপি) সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। একই বছরের ২৯ জুন নির্মাণকাজের গুণগতমান নিশ্চিত করাসহ পাঁচটি শর্তে আবারো প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়।

প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অনিয়মগুলোর সঙ্গে বিভিন্নভাবে নাম আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা উন্নয়ন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আনোয়ারুল হকের। গত বছরের ২০ মে প্রকল্পের ডিপার্টমেন্টাল প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন কমিটি (ডিপিইসি) সভা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত থাকার কথা বলে সম্মানীর অর্থ তুলে নেন আনোয়ারুল হক। যদিও সভায় অংশগ্রহণকারীদের নামের তালিকায় তার নামই নেই। এছাড়া টেন্ডার অনলাইনে যাওয়ার পরবর্তী ধাপে তিনি নির্ধারিত ঠিকাদারকে মোবাইল ফোনে -মেইলের মাধ্যমে প্রাক্কলিত মূল্যসহ তথ্যাদি সরবরাহ করা, প্রকল্পটির আওতায় পণ্য ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে -জিপি টেন্ডার বাণিজ্য, টেন্ডারের প্রাক্কলন সংরক্ষণ, ইজিপি সিস্টেমে কাজ টেন্ডারের নথি তিনি নিজের কাছে আটকিয়ে রাখাসহ বিস্তর অভিযোগ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিভাগ অফিসে নিম্নমানের কম্পিউটার, ল্যাব যন্ত্রপাতি, প্রিন্টার, মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে, যা এক বছরের কম সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। এসব বিষয়ে বিভিন্ন বিভাগ অফিস থেকে নানা অভিযোগ এলে তিনি আমলে নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি বেশিদিন হয়নি। আর প্রকল্পের কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। উপাচার্যের অনুমতি ছাড়া এর বেশি কথা বলার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

একইভাবে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু তালেবের বিরুদ্ধেও। আরডিপিপি অনুযায়ী, ১০তলা প্রশাসনিক অ্যানেক্স উত্তর ভবনের কাজ, ১০তলা ভিতে ৫তলা পর্যন্ত মাল্টিপারপাস ভবনের কাজ, ১০তলা ভিতে ৬তলায় ছাত্র হল এবং ১২তলা একাডেমিক কাম রিসার্চ ভবনের কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্কলিত মূল্য থেকে ১০ শতাংশ কমে প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় ছাত্রী হলের অবশিষ্ট অংশ দশমিক শতাংশ কম, সিনিয়র শিক্ষক কর্মকর্তা কোয়ার্টার দশমিক ৮১ শতাংশ কম, তৃতীয় ছাত্র হল ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে অন্য এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করার অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা এর আগের দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হন। দুদকের মামলায় কারাভোগ করেন। ওই মামলাটি এখনো চলমান।

প্রকল্পে বিভিন্ন অনিয়মের খবর পাওয়া যায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অডিট আপত্তির প্রতিবেদনেও। সেখানে বলা হয়, ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুযায়ী বরাদ্দ না থাকলেও প্রকল্পের আওতায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইসিটি সেলের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রিমেনিস কম্পিউটার লিমিটেডের কাছ থেকে ২৩ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। প্রকল্পের আওতায় কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করে ঊর্ধ্বতন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর জন্য কোনো বরাদ্দই ছিল না। একই অর্থবছরে বরাদ্দ না থাকলেও কোটি ৪০ লাখ টাকার গাড়ি কেনা হয়।

শুধু তা- নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবহির্ভূতভাবে রাজস্ব বাজেট থেকে ওই অর্থবছরে কোটি ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭২ টাকা প্রকল্প খাতে নেয়া হয়। বিষয়ও অডিট আপত্তি হিসেবে উঠে আসে। একইভাবে আপত্তি ওঠে ছয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে কোটি ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭২ টাকা অগ্রিম দেয়ার বিষয়েও। এছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান না করে রাস্তা নির্মাণ বাবদ কোটি ১৪ লাখ টাকা দেয়া হয় মেসার্স ভাওয়াল কনস্ট্রাকশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

কেবল অডিট আপত্তিই নয়, দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পূর্ত কাজের প্রাক্কলিত মূল্যের নির্দিষ্ট অংশ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা।

অডিট আপত্তিসহ সার্বিক অভিযোগ বিষয়ে সাবেক প্রকল্প পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, কিছু অডিট আপত্তি এসেছিল, তা প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আর প্রকল্পের সব অর্থই উপাচার্যের স্বাক্ষরে ব্যয় হয়েছে। তাই এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।

আরও