কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষ-সহিংসতা

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অর্ধশতাধিকের রক্তনালিতে বড় অস্ত্রোপচার

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সহিংসতায় সারা দেশে আহত হয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষ। গুলিবিদ্ধ হয়েছে অনেকে। আহত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) হাসপাতালে বেড়েছিল রোগীর চাপ। তিনদিনে (১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই) হাসপাতালটিতে আহত অর্ধশতাধিকের রক্তনালিতে জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ভাসকুলার

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সহিংসতায় সারা দেশে আহত হয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষ। গুলিবিদ্ধ হয়েছে অনেকে। আহত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) হাসপাতালে বেড়েছিল রোগীর চাপ। তিনদিনে (১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই) হাসপাতালটিতে আহত অর্ধশতাধিকের রক্তনালিতে জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ এসব অস্ত্রোপচার করেছে।

এনআইসিভিডির ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই তিনদিনে জরুরি ভিত্তিতে ৮৯ জন চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাদের মধ্যে ৭৯ জনকে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আহত একজন হাসপাতালে আসার আগে মারা যান। আর একজন মারা যান হাসপাতালে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে। ওই তিনদিনে ৫৩ জনের হাত ও পায়ের রক্তনালিতে বড় ও জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ৪৩ জনের অস্ত্রোপচারের পর তাদের জটিলতা নিরূপণ করে প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গুলিবিদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনোভাবে আহত ব্যক্তিরা ভাসকুলার সার্জারির (রক্তনালির অস্ত্রোপচার) জন্য আসেন। কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সহিংসতায় আহত অধিকাংশের পায়ের রক্তনালিতে ভাসকুলার সার্জারি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ বা বিভিন্নভাবে আহত হওয়ার ফলে তাদের হাত ও পায়ের ধমনি এবং শিরা ছিঁড়ে যায়। ভাসকুলার সার্জনরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ধমনি ও শিরা সংযুক্ত করেন। যাদের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তাদের প্রায় ৪০ শতাংশই গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ওই তিনদিনে ৫৩ রোগীর রক্তনালিতে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এত অস্ত্রোপচার করতে প্রায় এক মাস লেগে যায়। ফলে ওই দিনগুলোয় ভাসকুলার অস্ত্রোপচারে রোগীদের চাপ বেশি ছিল।

ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক সিয়াম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে যেসব রোগী এসেছিলেন, তাদের কেউ কেউ অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে এসেছিলেন। সবারই ভাসকুলার সমস্যা ছিল। আমরা অস্ত্রোপচার করে তাদের আবার সেসব হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আমাদের এখানে দৈনিক অন্যান্য রোগীও প্রচুর আসেন। যেমন সড়ক দুর্ঘটনার ফলে হাত-পায়ের রক্তনালি কেটে যায়। সার্জারি বড় নাকি ছোট তা নির্ভর করে কোন জায়গায় ইনজুরি তার ওপর।’

ভাসকুলার সার্জনরা জানান, পায়ের বা হাতের রক্ত সঞ্চালন হয় ধমনি (আটারি) ও শিরার (ভেইন) মাধ্যমে। ধমনির মাধ্যমে অক্সিজেন-সমৃদ্ধ রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রবাহিত হয়। আর কার্বন ডাই-অক্সাইড-সমৃদ্ধ রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে শিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে সঞ্চালন হয়। এর মধ্যে ধমনিতে স্পন্দন (পালস) থাকে। গুলিবিদ্ধ বা দুর্ঘটনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এসব ধমনি ও শিরা ছিঁড়ে বা কেটে যায়। এসব রক্তনালিতে তখন রক্ত সঞ্চালন হয় না। উপরন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। ৬ ঘণ্টার বেশি রক্ত সঞ্চালন না হলে কোষ মরে গিয়ে মাংসে পচন ধরে। সংক্রমণ ছড়ায়। কেউ দুর্ঘটনা বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ফলে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ভাসকুলার সার্জন রক্তনালিগুলোর সংযোগ স্থাপন করেন। সঠিক সময়ে সংযোগ করা না গেলে বা রক্তনালি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়। একই সঙ্গে রোগীর মৃত্যুঝুঁকিও থাকে। দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টার মধ্যে ভাসকুলার সার্জারি করতে হয়।

এনআইসিভিডির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ওই দিনগুলোয় কিছুটা চাপ ছিল। তিনদিনে এত ভাসকুলার সার্জারি করা কঠিন। তবে আমাদের চিকিৎসকরা দক্ষ ও আন্তরিক থাকায় সামাল দেয়া গেছে। প্রতিটি সার্জারি সফল হয়েছে। চাপ সামলাতে হাসপাতালের ফাংশনাল পাঁচটি অস্ত্রোপচার কক্ষেই ভাসকুলার সার্জারি করতে হয়েছে। শুক্রবারও সারা দিন অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।’

বাংলাদেশ ভাসকুলার সোসাইটির মহাসচিব ও ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা হোক বা যেকোনো কারণে হোক, হাত বা পায়ের রক্তনালি কেটে গেলে, ছিঁড়ে গেলে বা ব্লক হয়ে গেলে তাতে জরুরি ভিত্তিতে সার্জারি করতে হবে। এটা ৬ ঘণ্টার মধ্যে হতে হবে। না হলে কোষ মারা যায়। অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়।’

আরও