খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক সংকোচনে অস্থিতিশীল কিউবা

কাস্ত্রো ভাইদের মতো উতরে যেতে পারবেন মিগুয়েল ডিয়াজ কানেল?

কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনার অভিঘাত। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী। মুদ্রাবাজারে অবমূল্যায়িত কিউবান পেসো। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এর বিপরীতে কমছে মজুরি। ধস নেমেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। অন্যদিকে জনগণের বড় একটি অংশ নেমে এসেছে রাস্তায়। সব মিলিয়ে বর্তমানে মারাত্মক এক সংকটময়

কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনার অভিঘাত। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী। মুদ্রাবাজারে অবমূল্যায়িত কিউবান পেসো। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এর বিপরীতে কমছে মজুরি। ধস নেমেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। অন্যদিকে জনগণের বড় একটি অংশ নেমে এসেছে রাস্তায়। সব মিলিয়ে বর্তমানে মারাত্মক এক সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ কানেল।

সোভিয়েত-পরবর্তী যুগে আর কখনই এতটা গভীর সংকটে পড়েনি হাভানা। মার্কিন অবরোধের মধ্যেই দেশটির অর্থনীতিতে আরো বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে মহামারী। কিউবার অর্থমন্ত্রী আলেহান্দ্রো গিল ফার্নান্দেজ জানিয়েছেন, গত বছর দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ১১ শতাংশ হারে। তিন দশকের মধ্যে এটিই দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকোচনের সর্বোচ্চ হার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কিউবার জনগণের একাংশ প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ কানেলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে। এক সপ্তাহ ধরে দেশটির পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। প্রায়ই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে বিক্ষুব্ধরা। অন্যদিকে রাস্তায় নেমেছে প্রেসিডেন্টের সমর্থকরাও। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তারাও। বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ পশ্চিমাদের অনেকেই। অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করছেন সবচেয়ে বেশি। তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণেই কিউবার পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে।

কিউবায় কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে ১৯৫৯ সাল থেকে। ফিদেল রাউল কাস্ত্রো এবং চে গুয়েভারার নেতৃত্বে সংগঠিত এক অভ্যুত্থানে একনায়ক ফালগেনসিও বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে কমিউনিস্ট পার্টি। এর পর থেকেই প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কিউবাকে। দেশটির চলমান সংকট কিউবার গত ৬২ বছরের ইতিহাসে প্রথম নয়। এর মধ্যে স্থানীয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশকিছু বড় সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে দেশটিকে। এমনকি দেশটিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রমও হয়েছে অতীতে। দীর্ঘদিন দেশটির ওপর অবরোধ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ফিদেল কাস্ত্রোর আমলে এসব সংকট থেকে ভালোভাবেই উতরে যেতে পেরেছে দেশটি। ফিদেলের ভাই রাউল কাস্ত্রোর আমলেও কিউবার পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবারই প্রথম বড় কোনো সংকটের মুখোমুখি হলেন মিগুয়েল ডিয়াজ কানেল। কাস্ত্রো ভাইদের মতো সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা নেই তার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উতরে যেতে হলে অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাস্ত্রো ভাইদের মতোই নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে তাকে।

মহামারী অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে কিউবার প্রতিটি খাতই এখন চরম ভঙ্গুর দশায় এসে পৌঁছেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জন্যও অনেক ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল কিউবার স্বাস্থ্য খাত। বর্তমানে  খাতটিতেও ধসের উপক্রম দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল ফার্মেসিগুলোয় পেনিসিলিন বা অ্যাসপিরিনের মতো সাধারণ ওষুধেরও সংকট দেখা দিয়েছে। মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে চূড়ান্ত আকার নিয়েছে খাদ্য সংকট। যাদের হাতে এখনো কিছু অর্থ রয়েছে, বিন চালের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে একটু পরপর। একবার বিদ্যুৎ গেলে তা আর ফিরে আসছে না সহজে।

কিউবার গোটা অর্থনীতিকেই পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছে মহামারীর প্রাদুর্ভাব। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস ছিল পর্যটন খাত। কভিড-১৯-এর কারণে খাতে কর্মরতরা এখন পুরোপুরি বেকার। এছাড়া দেশটির অর্থনীতিতে প্রতি বছর ২০০-৩০০ কোটি ডলার যুক্ত হতো রেমিট্যান্স হিসেবে। এর সিংহভাগই আসত যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সে পথও পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। তার সময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করে ফেলায় কিউবান আমেরিকানরাও এখন আর নিজ দেশে অর্থ পাঠাতে পারছেন না। অন্যদিকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্পের কিউবা নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি হোয়াইট হাউজ। কিউবার বড় রফতানি পণ্য চিনি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবায় পণ্যটির বাণিজ্যেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। রয়টার্স জানাচ্ছে, দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আখের উৎপাদনও নেমে এসেছে ১৯০৮ সালের পর সর্বনিম্নে।

কিউবার রাজস্ব খাত যখন ধুঁকছে, তখনই সংকটকে আরো গভীর করে তুলেছে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা কিউবান পেসোর অবমূল্যায়ন। খাদ্যপণ্য আমদানিতে দেশটিকে এখন ব্যয় করতে হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন মারাত্মক এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কিউবার অর্থনীতিতে এর আগেও বড় রকমের ধস নেমেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। ওই সময় দেশটিতে দ্বৈত মুদ্রার নীতি গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে কিউবান পেসোর পাশাপাশি কনভার্টিবল পেসো (সিইউসি) চালু করে হাভানা। সোভিয়েত সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অর্থনীতিতে সৃষ্ট ক্ষত প্রশমনের জন্য ডলারের সমান বিনিময় হারের মুদ্রাটি চালু করা হয়েছিল। তবে দ্বৈত মুদ্রার নীতিও খুব একটা সফলতা নিয়ে আসতে পারেনি। দ্বৈত মুদ্রার ফলে দেশটিতে কালোবাজারির প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমতে থাকে। চলতি বছরের শুরুর দিকেই দ্বৈত মুদ্রার নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন মিগুয়েল ডিয়াজ কানেল।

এছাড়া বর্তমানে অর্থনীতির কিছুটা উদারীকরণের পথেও হাঁটছেন তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এসব অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যেই শুরু হয় মহামারীর প্রাদুর্ভাব। মার্কিন অবরোধ নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতির অবনতি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে মাত্র।

অন্যদিকে মার্কিন অবরোধ নিষেধাজ্ঞা কিউবার সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে না পারলেও দেশটির সাধারণ জনগণের জন্য জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। কিউবার পরিস্থিতি যে বর্তমানে একেবারেই ভালো নয়, তা স্বীকার করছে দেশটির সরকারও। প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডায়াজ কানেলও বলেছেন, গত কয়েকটি মাস কিউবানদের কীভাবে গিয়েছে, তা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছেন তিনি। একই সঙ্গে জনগণের প্রতি ধৈর্য ধারণেরও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকেই গোটা পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্যমতে, কিউবা যখন খাদ্য বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কভিডে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের আবেগকে কাজে লাগানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, আমাদের জনগণের সামনে একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়া উচিত; বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু আমাদের এও স্পষ্টভাবে দেখতে জানতে হবে, আমাদের এখন উসকে দেয়া হচ্ছে। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) গোটা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চায়, কিন্তু কিউবায় তারা কাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসতে চায়?

মিগুয়েল ডিয়াজ কানেলের ভাষ্যমতে, আমরা অতীতে বিভিন্ন গোলযোগ থেকে শিক্ষা নিয়েছি। সমস্যা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করে তার ভিত্তিতে আমাদের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং ভবিষ্যতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রতি আরেক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন অবরোধ নিষেধাজ্ঞায় কিউবার সংকট আরো গভীর হয়ে উঠেছে। অবরোধের কারণে আমরা আমাদের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারছি না। এটি আমাদের শ্লথ করে দিচ্ছে। উন্নতির পথে আমরা কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে যেতে পারছি না।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এরই মধ্যে কিউবার বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি ঘোষণা করে বক্তব্য রেখেছেন। গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দশকের পর দশক ধরে কিউবার কর্তৃত্ববাদী সরকারের দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুঃসহ পরিস্থিতিতে গিয়েছে কিউবার জনগণ। আমরা কিউবার জনগণ পরিস্থিতি থেকে তাদের মুক্তির জোর দাবির প্রতি সংহতি জানাচ্ছি।

আরও