বোরো
আবাদ পুরোটাই সেচনির্ভর। বিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্পগুলোর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ব্যবহার করা হয় ট্রান্সফরমার। সম্প্রতি
রংপুরে ট্রান্সফরমার চুরি বেড়ে যাওয়া ভাবিয়ে তুলেছে কৃষককে। গত বছর জেলার
আট উপজেলায় ৪৩টির বেশি ট্রান্সফরমারসহ বৈদ্যুতিক সামগ্রী চুরি হয়েছে। অনেক সময় পাহারাদারকে বেঁধে রেখে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এতে সরকারের যেমন আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তেমনি সেচ পাম্প সচল রাখতে কৃষককে জোগাড় করতে হয়েছে বাড়তি টাকা।
কৃষকের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার চুরির কারণে গত মৌসুমে এ অঞ্চলের কৃষকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কোনো উপকার হচ্ছে না। তাই চলতি বোরো মৌসুমে সেচ পাম্প নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন কৃষক।
রংপুর বিএডিসি (সওকা) জোন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া ও পীরগাছায় ৪৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেচ প্রয়োজন হয় বোরো মৌসুমে। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় বিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প চালু রয়েছে ৪৪৪টি। একেকটি সেচযন্ত্রের মাধ্যমে ৭০-১৩০ একর পর্যন্ত জমি সেচ দেয়া যায়।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৪৯ হাজার ১২৫ হেক্টর। শুরু হয়েছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এবং চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
রংপুর বিএডিসি জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর এবং পীরগঞ্জে গত বছর ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। একই সময় বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া এবং পীরগাছায় ১৮টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। প্রত্যেক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। শুরুতে বিএডিসির পক্ষ থেকে সেচ পাম্প বসাতে কৃষককে সহায়তা দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে যেকোনো খরচ সংশ্লিষ্ট কৃষককে বহন করতে হয়।’
বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের কাঁচাবাড়ী এলাকার কৃষক মো. হক সাহেব জানান, এ অঞ্চলে শুধু আমন এবং বোরো ধান নয়, বছরের তিন মৌসুমেই আবাদ হয়। তাই বিএডিসি থেকে সেচ পাম্প নেন তিনি। নিজের আবাদের পাশাপাশি অন্যদের সেচ সুবিধা দিতেন। ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর তার বাবাকে বেঁধে রেখে তিনটি নিয়ে যায় চোরেরা। চুরি হতে পারে সে আশঙ্কায় শুধু সেচের আগে ট্রান্সফরমার খুলে রাখতেন। কিন্তু পাহারা থাকার পরও ট্রান্সফরমার নিয়ে যাওয়ায় তিনি হতাশ। বোরো মৌসুমের আগে ধারদেনা করে ট্রান্সফরমার কিনে পুনরায় সচল করেছেন সেচ পাম্প। একেকটি ১০ কেভির ট্রান্সফরমার কিনতে খরচ হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা করে।
বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার মেরামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত মো. বেলাল হোসেন জানান, শুধু কয়েলে থাকা তামার তার বিক্রির জন্য ট্রান্সফরমারগুলো চুরি হয়। সেচ পাম্পগুলোর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৫ কেভিএ, ৭ কেভিএ এবং ১০ কেভিএ ট্রান্সফরমার ব্যবহার হয়। এগুলোয় কমপক্ষে ১৩-১৪ কেজি তামার তার থাকে। যার কেজি বিক্রি হয় ৮০০ টাকা দরে।
এদিকে অধিকাংশ ট্রান্সফরমার চুরির পর আইনগত ব্যবস্থা নিয়েও উপকার না হওয়ায় কৃষকের মাঝে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মো. ফেরদৌস আলী চৌধুরী জানান, জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এছাড়া রংপুরে কৃষকের নিরাপত্তায় তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়াতে কাজ শুরু করবেন।