ষাটের দশকের শুরুতেও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল পুরোদস্তুর কৃষিনির্ভর একটি দেশ। পরিবারভিত্তিক কিছু ব্যবসা তখনো মূলত ট্রেডিংয়ের ওপর ভর করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে সামরিক শাসক জেনারেল পার্ক চুং-হির আমলে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিকে পুরোপুরি রফতানিমুখী করে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। ব্যক্তি খাতে নিত্যনতুন শিল্প গড়ে তুলতে দেয়া হয় ভর্তুকি, প্রণোদনা, করছাড়, সহজ অর্থায়নসহ সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা। এসব সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বেশকিছু পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় হয়ে ওঠে। বিনিয়োগে বৈচিত্র্যায়নের পাশাপাশি গবেষণা-উন্নয়ন ও ব্যবসার সামাজিক ভিত্তি গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলোতেও বিশেষ গুরুত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব কনগ্লোমারেট স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে রূপ নেয় বৈশ্বিক জায়ান্টে।
সরকারের সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বড় হয়ে ওঠা এসব পারিবারিক ব্যবসা দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিচিতি পায় চেবল (চে=সম্পদ, বল=গোষ্ঠী) হিসেবে। স্যামসাং, হুন্দাই, এলজি, লোটের মতো দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বৈশ্বিক জায়ান্ট ব্র্যান্ডগুলোর প্রায় সবক’টিই এর বড় উদাহরণ। এসব কনগ্লোমারেটের হাত ধরে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়া। বর্তমানে এসব চেবলের পরিচালনার ভার দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। প্রজন্মান্তরে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পথ ধরে রেখেছে চেবলগুলো। বিভিন্ন খাতে ব্যবসা চালাচ্ছে উৎপাদনমুখী সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে। চেবলগুলোর মূল ও সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলো পরিচালিতও হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের হাতে। বর্তমানে এসব কনগ্লোমারেট দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে এসেছে। দেশটির পুঁজিবাজারের মোট ভ্যালুর প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করছে শীর্ষ পাঁচ চেবল।
দক্ষিণ কোরীয় চেবলগুলোর মতো বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন সময়ে প্রায় একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতে এখন পর্যন্ত অনেক উদ্যোক্তা বড় হয়েছেন। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এসব ব্যবসা দক্ষিণ কোরিয়ার চেবলগুলোর মতো ধারাবাহিক সম্প্রসারণের পথ ধরে রাখতে পারছে না। কিছু কিছু পারিবারিক ব্যবসা প্রথম প্রজন্মে ভালো করলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মে এসে পথ হারিয়ে ফেলছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আটকে থাকছে ট্রেডিং ব্যবসার ঘূর্ণাবর্তে। কোনো কোনো উদ্যোক্তার মাঝপথেই বিদেশে মূলধন সরিয়ে নেয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে ব্যবসা ও বাজার সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনো হাতে গোনা।
বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্প খাত ধরা হয় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতকে। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয়। গত চার দশকে খাতটি ব্যাপক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। যদিও এতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না বাণিজ্য শিক্ষার পণ্ডিতরা। তারা বলছেন, তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশ এখনো শুধু সরবরাহকারী হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। গবেষণা ও উন্নয়নে পিছিয়ে থাকায় শিল্পটিতে নতুন কোনো পণ্য উদ্ভাবন বা নির্মাণ হচ্ছে না। এছাড়া ক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষির সক্ষমতার দিক থেকেও দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশী সরবরাহকারীরা। শেষ পর্যন্ত খাতটি সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হচ্ছে খাতটিকে। সর্বশেষ কভিডকালেও বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠেছে।
রফতানিমুখী আরেক শিল্প ওষুধের ক্ষেত্রে অনেক অর্জন থাকলেও তাতে আত্মতুষ্টির কিছু নেই বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে খাতটির বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশের মোট চাহিদার ৯৭ শতাংশও পূরণ হচ্ছে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। যদিও উদ্ভাবন ও উন্নয়নের দিক থেকে খাতটি বেশ পিছিয়ে। সরকারের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে বড় হলেও এখনো মেধাস্বত্বভিত্তিক নিজস্ব পণ্য উদ্ভাবন করতে পারেনি খাতটি।
এছাড়া শিল্পোৎপাদন খাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে। দক্ষিণ কোরীয় চেবলগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। কর্মী কল্যাণসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রেও এসব প্রতিষ্ঠান বেশ সুনাম অর্জন করেছে। এর বিপরীতে ট্রেডিংভিত্তিক ব্যবসায় মনোযোগী বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা উচ্চমানের প্রযুক্তিনির্ভর ও মূল্য সংযোজিত (হাই এন্ড) পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসছেন কম। এতে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও হয়ে পড়ছে সীমিত।
পণ্ডিতদের ভাষ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে বিনিয়োগে বৈচিত্র্যায়ন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) কার্যক্রম। এর উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং গ্রুপের নাম। দেশটির বৃহত্তম চেবল স্যামসাং গ্রুপ একই সঙ্গে সেখানকার সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জনকারী কনগ্লোমারেট। গত শতকে কৃষিপণ্যের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা করেছিল স্যামসাং। সেখান থেকে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে ইলেকট্রনিকস, বীমা, জাহাজ, বিলাসবহুল হোটেল, হাসপাতাল, বিনোদন এমনকি শিক্ষা খাতেও। স্যামসাং গ্রুপের পরিচিতি মূলত ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড হিসেবেই। গোটা বিশ্বেই এখন শীর্ষ ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ডগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে স্যামসাং। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ক্রমাগত বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্ভাবনী শক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আজকের অবস্থানে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তিন লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করেছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। গত এক দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জিডিপিতে প্রতিষ্ঠানটির অবদান ছিল ১৪ শতাংশের বেশি। ফোর্বসের তথ্যমতে, স্যামসাং চেবলের স্বত্বাধিকারী লি পরিবার এখন হয়ে উঠেছে এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী পরিবার। এছাড়া হুন্দাই, এসকে গ্রুপ, এলজি, লোটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আজকের অবস্থানের পেছনেও বিনিয়োগে বৈচিত্র্যায়ন, আরঅ্যান্ডডি ও সামাজিক ভিত্তির অবদান রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে নানা মাধ্যমে উঠে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক পালাবদল ও ১৯৯৭ সালের মহামন্দার মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কনগ্লোমারেটগুলো সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত রেখেছে। খেলাপের সংস্কৃতি না থাকায় সে সময় স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেও ব্যাপক সহায়তা পেয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বড় চেবলগুলো।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী-রুবাইয়াত-উল ইসলামও মনে করছেন, মূলত গবেষণা ও উন্নয়নের দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার কারণেই বাংলাদেশী কনগ্লোমারেটগুলো বৈশ্বিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।
তবে বর্তমানে ধীরে হলেও অবস্থার পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন তিনি। এ বিষয়ে অধ্যাপক শিবলী-রুবাইয়াত-উল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, একসময়ের ট্রেডিংনির্ভর ব্যবসাগুলো এখন প্রডাকশননির্ভর ব্যবসায় রূপান্তর হচ্ছে। অনেকেই এখন প্রডাকশনের পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নের দিকেও ঝুঁকছে। বাংলাদেশে বেশকিছু বড় গ্রুপ রয়েছে, যারা এরই মধ্যে গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের পণ্যে নতুনত্ব ও উত্কর্ষ আনতে পেরেছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তারা বিদেশের বাজারেও স্থান করে নিয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, ব্যবসার সম্প্রসারণ নিশ্চিতে বাংলাদেশী কনগ্লোমারেটগুলোর পুঁজিবাজারে আসা উচিত। এতে কোম্পানির ভ্যালুয়েশন বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয় মূলধনের জোগানও সহজ হবে।
দেশের অর্থনীতিতে বাজারকেন্দ্রিক উদারীকরণের সূচনা হয় আশির দশকে। ওই সময়ে শিল্প খাতে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণকে এগিয়ে নিতে নয়া শিল্পনীতি বা নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি হাতে নিয়েছিল সরকার। এক্ষেত্রে প্রধান মনোযোগ পেয়েছিল ভারী ও কৌশলগত শিল্প খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল রফতানিমুখী শিল্প বিকাশ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ওপর। শিল্পায়নকে গতিশীল করতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকেও করে দেয়া হয়েছিল অবাধ ও বাধাহীন। এজন্য সরকারি দুটি ব্যাংকের বেসরকারীকরণের পাশাপাশি নতুন বেশকিছু বেসরকারি ব্যাংককেও কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন দেয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহে ব্যক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। গড়ে তোলা হয় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টাও করা হয়। তবে এর সুফল পাওয়া গিয়েছে সামান্যই। বরং দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ব্যাপক মাত্রায়।
এরপর গত কয়েক দশকের বিভিন্ন সময়ে সরকার বেসরকারি খাতকে আরো নানা মাত্রার সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। যদিও দেশীয় কনগ্লোমারেটগুলোর মধ্যে খুব কমই এসব সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। ব্যবসার স্থিতিশীল সম্প্রসারণ নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও খুব একটা ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আছে। কিন্তু তা কাজে লাগিয়ে কনগ্লোমারেটে রূপ নেয়া বড় প্রতিষ্ঠান তেমন একটা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানকার উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই প্রথম প্রজন্মের। সে হিসেবে এখনো অনেক সুযোগ বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের উদ্যোক্তা শ্রেণীর বেশির ভাগই প্রথম প্রজন্ম। এখনো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের আছে। আর তা করতে হবে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কাজে লাগিয়ে। আমাদের পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে লোভ অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। শুরুর দিকে কিছু গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল শুধু ধনী হওয়ার। রাষ্ট্রীয় সুবিধা ছিল, কিন্তু তা কাজে লাগানো হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থে। জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে কেউ সে রকমভাবে এগোয়নি।
তিনি আরো বলেন, একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল। কিন্তু তা ছিল না। কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সুশাসন ছিল না। মানসিকতার উন্নয়নের জায়গাটায় জাতিগত সমস্যা ছিল। নীতির ধারাবাহিকতাও ছিল না। আবার বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এমন ছিল যে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা থেকে ব্যবসা বড় করতে পারেননি। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে ভাবতে পারেননি।
তবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে এখনো অনেক সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল বৈষম্যপূর্ণ। তখন ব্যক্তি খাতে বাঙালি মালিকানাধীন তেমন কিছুই ছিল না। ওই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এক প্রজন্মে বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা যতটুকু এগিয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এজন্য তারা সম্মান ও কৃতজ্ঞতা পাওয়ারও যোগ্য। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আরো অনেক কিছু করার ছিল। সে সম্ভাবনা এখনো আছে, পর্যায়ক্রমে যা অর্জন সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।
একই মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর মানুষ তাদের যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। অনেক সৃজনশীল উদ্যোক্তা আছেন, যারা ব্যবসায়ী সমাজ নিয়ে সাধারণ ধারণাগুলোর কারণে আলোচনায় আসতেও ইতস্তত বোধ করেন। আবার ব্যবসার উদ্যোগগুলোয় গবেষণার ঘাটতিও আছে। আমাদের আরো অনেক কিছু করার সম্ভাবনা আছে এবং ছিল। কিন্তু মৌলিক কিছু বিষয়ে ঘাটতি আছে, যেমন শিক্ষা। এর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া সুশাসন দ্বারা পরিচালিত পরিকল্পিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন, যার মধ্য দিয়ে একজন ভুল করলেও তা শুধরে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবকাঠামো ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিছিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজেস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের (ইউনাইটেড গ্রুপ) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনউদ্দিন হাসান রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, অবকাঠামো ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হলে আমাদের কনগ্লোমারেটগুলোর ব্যবসা আরো বড় হবে। আমাদের এখানে এক দশক ধরে বড় ধরনের অবকাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের এখানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যেই সেটির ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে সেই অবকাঠামোর সুফল আর পাওয়া যায় না। বিদেশে এ ধরনের অবকাঠামোর সুবিধা অনেক বছর ধরে পাওয়া যায়। গবেষণা ও উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হলে আমাদের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কারিগরি শিক্ষা প্রসারের কারণে সেখানকার কর্মীদের দক্ষতা অনেক বেশি হয়। এক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে রয়েছি।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে ওয়ালটন। বিশ্বের অনেক দেশে রফতানিও করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ বণিক বার্তাকে বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ তৈরি হয়েছে। অন্যদের তুলনায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি, এটি বলব না। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার কথাই যদি বলি তারা আমাদের অনেক আগেই শিল্পায়ন শুরু করেছে। আমরা স্বাধীন হয়েছি তাদের অনেক পর। এক্ষেত্রে আমরা সময়ের ব্যবধানে পিছিয়ে আছি। ওয়ালটনের কথাই ধরুন। আমাদের পথচলা ১২ বছরের। এরই মধ্যে ৪০টি দেশে পণ্য রফতানি করছি। গ্লোবাল ইলেকট্রনিকস জায়ান্টরা দশকের পর দশক ব্যবসা করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের মতো আমরাও যদি আরো কয়েক দশক ব্যবসা করি, আমাদের অবস্থানও অনেক ওপরে চলে যাবে। গবেষণা ও উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ইলেকট্রনিক ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে আমাদের।