চট্টগ্রামের গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত

সংরক্ষিত এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক, জমি দখল ও বৃক্ষ নিধনে হুমকিতে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য

গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত—বঙ্গোপসাগরের উপকূলে প্রকৃতির এক অনন্য মোহময় বিস্তার। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ও ভাটেরখিল এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত এ উপকূলীয় অঞ্চল একসময় ছিল নিস্তব্ধ সবুজ বন ও জলাভূমির সমন্বিত এক জীববৈচিত্র্যপূর্ণ আবাসভূমি।

কেওড়া, বাইন, গেওয়া, গরান, পানকাটা ও নুনিয়া গাছের ঘন সবুজ ছায়ায় ঢাকা এ বনভূমি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, বরং উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয়ও।

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক সমাগম ও পরিবেশগত চাপ লক্ষ্য করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক কার্যালয় ২০১৮ সালের দিকে এলাকাটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। ‘গুলিয়াখালী কোস্টাল বে-ভিউ ইকোপার্ক’ হিসেবে গড়ে তুলে সংবেদনশীল এ উপকূলীয় বনকে রক্ষার পাশাপাশি টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তবে ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেখানকার ২৫৯ দশমিক ১০ একর ভূমিকে ‘পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে বন বিভাগের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক দ্বৈততার এ প্রভাব সরাসরি পড়ে প্রকৃতির ওপর। বাড়তে থাকে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার, জমি দখল ও অবাধে বৃক্ষ নিধন।

এক সময় যে উপকূলীয় বন ছিল হরিণ, পাখি ও সরীসৃপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল; সেখানে আজ চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে উপকূলীয় এ বনে ১০টি চিত্রল হরিণ অবমুক্ত করা হয়েছিল। বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সময়ের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৮-১৯ সালের দিকে এ বনে শপাঁচেকের মতো হরিণের উপস্থিতি দেখা যেত। এছাড়া টিয়া, কাঠঠোকরা, কয়েক প্রজাতির মাছরাঙা, বক, সারস ও ঘুঘু প্রজাতির পাখির আবাস এটি। সেই সঙ্গে রয়েছে খেকশিয়াল, কাঠবিড়াল, বনবিড়াল, বানর, বেজী, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিচরণ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত মানুষের উপস্থিতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় সে প্রাণবৈচিত্র্য ক্রমেই আজ সংকটের মুখে।

গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত ঘিরে গড়ে ওঠা উপকূলীয় বনাঞ্চলকে ‘ইকোপার্কে রূপান্তর’ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুরক্ষা কৌশল বলে মনে করে বন বিভাগ। তাদের মতে, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বনাঞ্চলটিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হলে উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে; যা জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খাদ্যশৃঙ্খল সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বনভূমি সংকোচন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস ইত্যাদি হুমকি থেকে রক্ষা পাবে বনটি। এছাড়া বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বনাঞ্চলের উন্নয়নসহ পরিকল্পিত পর্যটনের সুবিধা বাড়বে। উপকূলীয় বনের খাল ও জলাভূমিতে বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ ও লাল কাঁকড়ার প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং কেওড়া বাগানে মৌমাছির প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায়ও ইকোপার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ প্রস্তাব প্রণয়নের জন্য তৎকালীন বন অধিদপ্তর পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন উপপ্রধান বন সংরক্ষক (বন ব্যবস্থাপনা উইং)। বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভাগ থেকে আসা প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে কমিটি ‘গুলিয়াখালী কোস্টাল বে-ভিউ ইকোপার্ক’ ঘোষণার সুপারিশ দেয়। বন কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল উপকূলীয় বন ব্যবস্থাপনাকে একটি কাঠামোগত রূপ দেয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪ হাজার ৬১৬ দশমিক ৭৭ একর উপকূলীয় বনভূমির মধ্যে গুলিয়াখালী মৌজায় রয়েছে ৫৪৫ দশমিক ১২ একর হস্তান্তরিত জমি এবং ২ হাজার ২২৫ দশমিক ৭৯ একর সংরক্ষিত বনভূমি। অন্যদিকে ভাটেরখিল মৌজায় ১ হাজার ১১৫ দশমিক ৮৬ একর হস্তান্তরিত এবং ৭৩০ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে।

এদিকে গুলিয়াখালীকে পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পর থেকেই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক সমাগম বাড়ে, গড়ে ওঠে স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন পর্যায়ে সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত বনভূমির গাছ কেটে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য উপকূলীয় পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। সম্প্রতি রাতের আঁধারে সরকারি বনভূমি দখলের উদ্দেশ্যে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে, যা ম্যানগ্রোভ বাগান ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে বন বিভাগ প্রশাসনের তৎপরতা বাড়াতে কয়েক দফায় চিঠি দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপকূলীয় বন বিভাগের সীতাকুণ্ড রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রনি আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও বন বিভাগ নিয়মিতভাবে গুলিয়াখালী সৈকতে গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত আছে। কিন্তু পর্যটন অঞ্চল ঘোষণার কারণে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের হাতে নেই। ফলে অবৈধ দখল ও গাছকাটা বন্ধসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই।’ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এ সংরক্ষিত ও উপকূলীয় বনটি রক্ষায় ইকোপার্ক কিংবা বিশেষায়িত কোস্টাল ট্যুরিজম এলাকা ঘোষণার মাধ্যমে উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে মনে করেন এ বন কর্মকর্তা।

বনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিরসরাই অঞ্চল ৩৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র উপকূল অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। উপজেলাটির শেষ প্রান্ত থেকে সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূলে শতাধিক শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপনের কারণেও উপকূলীয় বন আজ নিশ্চিহ্ন। গুলিয়াখালী সমুদ্র উপকূলও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং দখল-দূষণে প্রতিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। প্রায় ৪ হাজার ৬০০ একরের উপকূলীয় বনটিকে সুরক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করা না গেলে অচিরেই সংরক্ষিত বন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ফররুখ আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে একটি পরিকল্পনা করছে। প্রতিটি জেলায় অবস্থিত বিভিন্ন পর্যটন এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যটকদের সমাগম নিশ্চিত করতে উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হবে। ফলে বর্তমানে গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে, তা দ্রুত নির্মূল হবে বলে আশা করছি।’

আরও