প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০০৯-১০ অর্থবছরে (এপ্রিল-মার্চ) ট্রেডারদের মাধ্যমে বিক্রীত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় মূল্য (ভারযুক্ত) ছিল ৫ রুপি ২৬ পয়সা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসে তা নেমে আসে ৩ রুপি ৭২ পয়সায়। একই সময়ের এক্সচেঞ্জ মার্কেটে বিক্রীত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ভারযুক্ত গড় মূল্য ৪ রুপি ৯৬ পয়সা থেকে নেমে এসেছে ৪ রুপি ৬৯ পয়সায়। এ ১৩ অর্থবছরের ব্যবধানে স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুতের বাজারে ট্রেডারদের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনাবেচা হয়েছে এক্সচেঞ্জ মার্কেটে। মূলত সাধারণ ভারতীয় ভোক্তাদের লাভবান করতেই এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মাধ্যমে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলে দেশটির সরকার। এ সময়ের মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার করলেও দেশটির বাজারে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য কখনই ৫ রুপি ছাড়ায়নি। যদিও এ সময় দেশটির রাজ্যগুলোর ও কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। বিকাশ ঘটেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের। এর মধ্যেও যথাযথ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারায় লাভবান হয়েছেন দেশটির বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবাই। ভারত সরকারের জন্যও কখনই বড় ধরনের আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দেখা দেয়নি বিদ্যুৎ খাত।
উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একের পর এক আইপিপি ও ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র (রেন্টাল-কুইক রেন্টাল)। পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্টের (পিপিএ) ভিত্তিতে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ তুলেছেন, এসব পিপিএ চুক্তির গোটা মডেলই অপ্রতিযোগিতামূলক। চুক্তিগুলোয় ভোক্তা স্বার্থের চেয়ে উদ্যোক্তাদের মুনাফার নিশ্চয়তা ও আর্থিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বেশি। গত কয়েক বছরে দেশে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়লেও তাতে আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের উদ্যোক্তা ছাড়া লাভবান হয়নি আর কেউই। একদিকে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে ক্রমাগত বাড়তি দামে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান দিতে দিতে রীতিমতো দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বিপিডিবি। সরকারি ভর্তুকি আর ঋণ ছাড়া সংস্থাটির কার্যক্রম চালানো এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এমনকি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাওনাও পরিশোধ করতে পারছে না বিপিডিবি। উল্টো ঋণের বোঝা বাড়ছে।
বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার ছাড়া দেশের বিদ্যুৎ খাতকে এ লোকসানের চক্রব্যূহ থেকে বের করে আনা অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের বিদ্যুতের বাজারে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য বাড়লেও সেখানকার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। এতে গ্রাহক পর্যায়েও সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুতের বাজারে বিদ্যুৎ কেনাবেচা হচ্ছে এক বছরেরও কম সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক হিসেবে। এক্ষেত্রে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ট্রেড লাইসেন্সধারীদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেনাবেচা হয়ে থাকে। ডিস্ট্রিবিউশন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি লেনদেন করে থাকে। ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (আইইএক্স) এবং পাওয়ার এক্সচেঞ্জ ইন্ডিয়া লিমিটেড (পিএক্সআইএল) নামে দুটি এক্সচেঞ্জ রয়েছে, যার মাধ্যমেও বিদ্যুতের ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। এছাড়া ডেভিয়েশন সেটেলমেন্ট মেকানিজমের (ডিএসএম) মাধ্যমেও লেনদেন হচ্ছে। ভারতের নিবন্ধিত ট্রেডার্সদের মধ্যে টাটা পাওয়ার ও আদানি পাওয়ারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এক্সচেঞ্জের মাধ্যমেও বিদ্যুতের লেনদেনে সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ মার্কেট থেকে ভারতের বাইরেও বিদ্যুৎ রফতানি হচ্ছে।
ভারতের বিদ্যুৎ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনের (সিইআরসি) এক প্রতিবেদনে হারফিনডাল হার্শম্যান ইনডেক্স (এইচএইচআই) অনুসারে ট্রেডারদের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুতের লেনদেনের পরিমাণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ট্রেডারদের মাধ্যমে বিদ্যুৎ লেনদেনের পরিমাণের ক্ষেত্রে বাজার শক্তিমত্তার ঘনত্ব ২০২১-২২ সময়ে সহনীয় পর্যায়ে ছিল। অর্থাৎ বিদ্যুতের বাজারে ট্রেডারদের আধিপত্য নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে ছিল। এ সময়ে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ নিয়ে ট্রেডারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম কমেছে।
ট্রেডার ও এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ২০২১-২২ সময়ে দেশটির স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুতের বাজারের ৭৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এখানে বিদ্যুতের দামের ওপর প্রভাব ফেলে মূলত চুক্তির প্রকৃতি ও সময়। ট্রেডারদের মাধ্যমে সাধারণত রাজ্য পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অঞ্চলভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। ট্রেডারদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেনাবেচার জন্য সপ্তাহ কিংবা মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময়ের জন্য চুক্তি হয়। অন্যদিকে এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে একদিন আগে বিদ্যুৎ কেনা যায়।
সিইআরসির প্রতিবেদনে ভারতের স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুতের বাজারে ট্রেডার্স ও এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ ও প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা হিসেবে বিদ্যুতের দামের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০০৯-১০ সময়ে ট্রেডার্সদের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ২৬ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ। সে সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ভারিত গড় হারে দাম ছিল ৫ রুপি ২৬ পয়সা। একই সময়ে এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ। এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ভারিত গড় হারে দাম ছিল ৪ রুপি ৯৬ পয়সা। ২০২১-২২ সময়ে এসে ট্রেডার্স মার্কেটে বিদ্যুৎ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউনিটে। এ সময়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৩ রুপি ৭২ পয়সা। অন্যদিকে ২০২১-২২ সময়ে এক্সচেঞ্জ মার্কেটে লেনদেনকৃত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ১০১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ইউনিট। এ মার্কেটে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় দাম ছিল ৪ রুপি ৬৯ পয়সা। দেখা যাচ্ছে, ১৩ বছরের ব্যবধানে স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুতের বাজারে ট্রেডারদের মাধ্যমে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ লেনদেন হয়েছে তার চেয়ে বেশি হয়েছে এক্সচেঞ্জ মার্কেটে। এতে ট্রেডার্স মার্কেটে বিদ্যুতের দাম এ সময়ে ক্রমশ করেছে। অন্যদিকে এক্সচেঞ্জ মার্কেটে বিদ্যুতের দাম ওঠানামা করলেও তা কখনো ৫ রুপি ছাড়ায়নি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা বিপিডিবির সঙ্গে পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্টের (পিপিএ) ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিপিএগুলোয় মূলত বিদ্যুতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও মুনাফার নিশ্চয়তার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। এখানে তাদের বিনিয়োগ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত। ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিদ্যুতের গ্রাহকদের ঝুঁকি ও ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। বিপিডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় উৎপাদন মূল্য ছিল ৬ টাকা ৩৩ পয়সা। ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন মূল্য ছিল যথাক্রমে ৬ টাকা ১ পয়সা, ৫ টাকা ৯১ পয়সা ও ৬ টাকা ৬১ পয়সা। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদনমূল্য বেড়ে ৮ টাকা ৮৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে আইপিপিগুলোর ১১ টাকা ৫৫ পয়সা ও রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর ৯ টাকা ৮০ পয়সা ব্যয় হয়েছে।
বিপিডিবির বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে মূলত তিন ধরনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমত, একক ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবি উৎপাদন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বাল্কমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করবে। দ্বিতীয়ত, এ বিদ্যুৎ ক্রয়ে সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হুইলিং চার্জ প্রযোজ্য হবে। তৃতীয়ত, খুচরা পর্যায়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে। এ খুচরা পর্যায়ে বিক্রির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম সাশ্রয়ী রাখার জন্য সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে।
বর্তমান অনুসৃত পিপিএ মডেল অনুযায়ী, বিপিডিবি উৎপাদন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে, গ্রাহকের কাছে বিক্রি করছে তার চেয়ে কম দামে। এ লোকসানকে সমন্বয় করতে হচ্ছে ভতুর্কির মাধ্যমে, যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে সদ্যসমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিডিবিকে ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
অনেকটা একই রকম অদূরদর্শী ও অপরিকল্পিত ক্রয়চুক্তির মডেল অনুসরণ করতে গিয়ে পাকিস্তান বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সার্কুলার ডেবটের ফাঁদে পড়ে বিপন্ন হয়েছে দেশটির বিদ্যুৎ খাতসহ গোটা অর্থনীতি। দেশটি এখন বিদ্যুতের দাম কমানোর মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে। এর পরও দেশটিতে বিদ্যুতের দাম ভারত, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও চীনের চেয়ে ৩০-৪০ শতাংশ বেশি। এ অবস্থায় দেশটির সরকার আইপিপিগুলোর সঙ্গে অন্যায্য ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য চুক্তি করছে। এজন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি লাইবরের স্প্রেড কমানো হয়েছে। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ২০-২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। কমানো হয়েছে বীমা প্রিমিয়ামও। বিলম্বিত পরিশোধের ক্ষেত্রে সুদের ব্যয় কমানো হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের ইকুইটি বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্নের (আরওই) পরিমাণও নির্মাণ পর্যায়ে ১৩ শতাংশ কমানো হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের আরওই কমানোর বিষয়ে গুঞ্জন রয়েছে বলে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের (পিআইডিই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে বিদ্যমান পিপিএগুলোর আওতায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিদ্যুৎ ক্রয়ে দুই ধরনের খরচকে বিবেচনায় নেয়া হয়। এসব খরচ হিসাব করে নির্দিষ্ট মেয়াদকাল হিসাব করে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নির্ধারণ হয়। পিপিএ চুক্তির আওতায় প্রথমত, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ঋণ পরিশোধ, রিটার্ন অব ইকুইটি (আরওই), নির্ধারিত পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য কিছু নির্ধারিত খরচ হিসাব করা হয়। এখানে বিপিডিবিকে একক ক্রেতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্রয় করতে হবে। এর অন্যথায় সংস্থাটিকে অব্যবহৃত সক্ষমতার বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জ বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বসিয়ে রাখার বিপরীতে নির্দিষ্ট ব্যয় বহন করতে হয়। দ্বিতীয়টি হলো জ্বালানি ব্যয়। জ্বালানিভেদে এটি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। উৎপাদনে জ্বালানি তেল ডিজেল, ফার্নেস অয়েল বা কয়লা ব্যবহার হলে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী বিপিডিবির এর দাম পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গত ১২ বছরে বিপিডিবির বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে সাড়ে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত ১২ বছরে বেসরকারি এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা কখনই ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করা যায়নি।
বিদ্যমান পিপিএ চুক্তির আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে গিয়ে বিপিডিবি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়েও সংস্থাটির আর্থিক বোঝা কমাতে পারছে না সরকার। এর ফলে সংস্থাটিকে একদিকে যেমন বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে গিয়ে গ্রাহককে কম মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে পারছে না সংস্থাটি। আবার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিলও পরিশোধ করতে পারছে না।
বিপিডিবি-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে বিপিডিবির বকেয়া দেনার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। আইপিপিগুলোও এখন বিদ্যুৎ বিক্রির অর্থ না পেয়ে উৎপাদনসহ পরিচালন ব্যয় নিয়ে সংকটে পড়েছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি ফয়সাল করিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নে মুক্তবাজার প্রয়োজন। আমাদের মুক্তবাজারে প্রবেশ করতে হবে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি শেষ হওয়ার পর যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবি চুক্তি সম্প্রসারণ করছে, সেখানে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্টে’ মডেল হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন আকর্ষণে ‘টেক অর পে’ মডেল অনুসৃত হয়েছে। যেখানে পিপিএ চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছিল।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান পিপিএগুলোর আওতায় বিদ্যুতের খোলাবাজার তৈরির সুযোগ নেই। তবে আগামীতে স্মার্ট গ্রিড লাইন, মাল্টিপল বায়ার ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর এককভাবে উৎপাদন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা গেলে তাতে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার তৈরি হবে। এতে বিদ্যুৎ ক্রয়ে বিপিডিবির চাপ কমবে এবং খরচও কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারতের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিদ্যুতের খোলাবাজার তৈরি করতে হলে মাল্টিপল বায়ার তৈরি করতে হবে। এককভাবে শুধু বিপিডিবি ক্রেতা হলে চলবে না। আর এজন্য শুরুতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নিজ নিজ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চাহিদার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করতে হবে। বর্তমান বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী দেশে বিদ্যুতের এক্সচেঞ্জ মার্কেট গড়ে তোলা কঠিন। তবে ভবিষ্যতে স্মার্ট গ্রিডলাইন তৈরি করা গেলে এ ধরনের মার্কেট গড়ে তোলা যেতে পারে। তাতে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে এবং বিদ্যুতের দাম অনেক কমে আসবে। যেমন ভারত থেকে আমরা ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এক্সচেঞ্জ মার্কেট থেকে বিদ্যুৎ কিনছি। এ কারণে আমরা কম মূল্যে বিদ্যুৎ পাচ্ছি।’
বিদ্যুৎ ক্রয়ে সিঙ্গেল বায়ার মডেল থেকে বেরিয়ে মাল্টিপল বায়ার মডেলে যাওয়ার পরিকল্পনা বিদ্যুৎ বিভাগের দীর্ঘদিনের। এ প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে এবং বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ক্রয়ে সিঙ্গেল বায়ার মডেল থেকে বেরিয়ে মাল্টিপল বায়ারে সংস্কারের পরিকল্পনা বিদ্যুৎ বিভাগের রয়েছে। একটি বাজার কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা রয়েছে। এ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিতরণ লাইনগুলো সরাসরি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জেনারেটরে যুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এসব বিষয় অগ্রাধিকার পাবে।’