টিকা কার্যক্রমের দুই মাস পেরোলেও কমেনি হামে সংক্রমণ ও মৃত্যু

দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরুর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৮৮৭ শিশু, যার মধ্যে ৮০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৃত সাত শিশুর মধ্যে ছয়জন ঢাকায় এবং একজন বরিশালে মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গে ৫৮৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরো ৯৩ শিশু। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭৭-এ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৯১ হাজার ৭৮৯ শিশুর। এ সময় ল্যাবরেটরিতে হাম শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৪৯ শিশুর। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৩৮ শিশু। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৫ হাজার ৯০২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭১ হাজার ৯৭০ জন।

সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বিভাগে ল্যাব-নিশ্চিত হাম ও রুবেলা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২৮ জনে।

বিভাগে হামজনিত জটিলতায় মোট ৭৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব-নিশ্চিত রোগী তিনজন হলেও লক্ষণভিত্তিক সন্দেহভাজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা। বিভাগের মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ ৬০টি মৃত্যু হয়েছে এ দুই জেলায়।

সিলেটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘শরীরে অপুষ্টি এবং বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে টিকা নেয়ার পরও পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। ফলে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে দ্রুত জটিল অবস্থায় পৌঁছে যায়।’

তিনি বলেন, ‘যেসব শিশু হাসপাতালে আসছে তাদের অধিকাংশই টিকা নেয়নি। মাঝেমধ্যে বড়দের মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে, যাদের অনেকেই কখনো টিকা নেয়নি। তাই প্রাপ্তবয়স্কদেরও টিকার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।’ তার দাবি, টিকা নেয়ার পরও হামে আক্রান্ত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বরিশাল বিভাগ বর্তমানে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৯২৬ জন। এ সময় ৩২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বিভাগে সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ৩৯ জন এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে আরো ১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯৮ জন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) দেখা দেয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। মূলত নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে, তবে কমার প্রবণতা অনেক ধীর। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা আরো কিছুদিন চলবে। পরিস্থিতি এখন নিম্নমুখী, তবে দ্রুত কমছে না। হামে আক্রান্ত অনেক শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং এ জটিলতায় মৃত্যুও হচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। টিকাদান কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে এবং যারা আগে টিকা পায়নি, তাদের আবার টিকা দেয়া হচ্ছে।’

আরও