তাকসিম চলে গেলেও পানির দাম কমাচ্ছে না ওয়াসা

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই নিজ দপ্তরে অনুপস্থিত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বুধবার এক ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগ করেছেন তিনি। তার পদত্যাগের পর ঢাকা ওয়াসার নতুন এমডির দায়িত্ব পেয়েছেন প্রকৌশলী একেএম শহিদ উদ্দিন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই নিজ দপ্তরে অনুপস্থিত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বুধবার এক ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগ করেছেন তিনি। তার পদত্যাগের পর ঢাকা ওয়াসার নতুন এমডির দায়িত্ব পেয়েছেন প্রকৌশলী একেএম শহিদ উদ্দিন। 

তাকসিম এ খানের আমলে ওয়াসার পানির মান ও দাম নিয়ে অভিযোগ ছিল অনেক। তার পদত্যাগের পর সংস্থাটি পানির দাম কমাবে বলে প্রত্যাশা করছিলেন অনেকেই। যদিও সংস্থাটিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া এমডি প্রকৌশলী একেএম শহিদ উদ্দিন জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে পানির দাম কমানোর কথা ভাবছে না ওয়াসা। 

বণিক বার্তাকে গতকাল তিনি বলেন, ‘‌সবকিছুর দাম বাড়তি। পানির দাম কমানো কীভাবে সম্ভব?’

এ সময় ওয়াসার সাবেক এমডির দুর্নীতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‌ওয়াসায় কোনো দুর্নীতি হয়নি। কোনো প্রমাণ থাকলে দিয়ে যান, আমি অ্যাকশন নেব।’ 

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মধ্যেই বছর বছর ওয়াসার পানির দাম বাড়িয়েছেন তাকসিম এ খান। অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর জন্যই প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি। 

বারবার দাম বাড়ালেও ওয়াসার লাইন দিয়ে সরবরাহকৃত পানি ময়লা বলে অভিযোগ রয়েছে গোটা ঢাকাবাসীর। যদিও এ পানি ফোটানো ছাড়া খাওয়া যাবে বলে একসময় মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। সে সময় জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ওয়াসার ভবনে এসে সংস্থাটির পরিবাহিত পানি দিয়ে বানানো শরবত তাকসিম এ খানকে খাওয়ার দাওয়াতও দিয়েছিলেন। যদিও সে দাওয়াত গ্রহণ করেননি ওয়াসার সাবেক এমডি। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দিয়েছিল। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়াসার পানি কোনোভাবেই পানযোগ্য নয়। কিন্তু গ্রাহকদের এ-সংক্রান্ত কোনো দাবি আমলে নেননি তাকসিম এ খান।’

আবার ওয়াসার পানি সরবরাহও সবসময় নিরবচ্ছিন্ন থাকে না। গরমের মৌসুমে রাজধানীর কিছু এলাকার বাসিন্দাদের পানির দাবিতে বিক্ষোভও করতে দেখা গেছে। 

ঢাকা ওয়াসার অনিয়ম-দুর্নীতি ও গ্রাহকসেবার বিভিন্ন ঘাটতির দিক নিয়ে ২০১৯ সালে ‘ঢাকা ওয়াসা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাতে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহে ব্যর্থ। ৯১ শতাংশ গ্রাহক পানি ফুটিয়ে পান করে। পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে বছরে ৩২২ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হয়। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ১৬ বছরে ঢাকা ওয়াসা পানির দাম বাড়িয়েছে ১৬ বার। এর আগে করোনার মধ্যেও ঢাকা ওয়াসা দুই বছরে দুবার আবাসিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে পানির দাম বাড়িয়েছিল। 

২০২২ সালে ওয়াসা পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। বিধি প্রণয়ন না করে ওয়াসার পানির মূল্যবৃদ্ধি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এরপর প্রায় দুই বছর পানির দাম বাড়ানো নিয়ে সেভাবে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি।

সর্বশেষ গত ১ জুলাই পানির দাম ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে ওয়াসা। ওই সময় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম নির্ধারণ করেছে ১৬ টাকা ৭০ পয়সা, যা আগে ছিল ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য একই পরিমাণ পানির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬ টাকা ২০ পয়সা, যা ছিল ৪২ টাকা। 

অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ নিয়ম মেনে পানির দাম বাড়ানো হয়নি। আইন অনুযায়ী, প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়াতে পারে ঢাকা ওয়াসা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে ওয়াসা বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। আর ৫ শতাংশের বেশি বাড়াতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। 

সর্বশেষ পানির দাম বাড়ানোর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছিল ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি (ডিএসএল) পরিশোধের টাকার পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমান পানির দামে ওয়াসার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডিএসএল পরিশোধ দুরূহ হয়ে পড়েছে। ঋণের টাকা পরিশোধ এবং ব্যয়ভার বহন করতে পানির বিশেষ মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন।

সর্বশেষ ১০ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডে আলোচনা হয়নি বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ওয়াসার বোর্ড সদস্য দীপ আজাদ। সম্প্রতি এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে বোর্ডের সভায় আলোচনা হয়নি। বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কীভাবে ১০ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে, বিষয়টি আমার জানা নেই।’

তাকসিম এ খানের আমলে ঢাকা ওয়াসায় বৈদেশিক ঋণের টাকায় বড় বড় কয়েকটি প্রকল্প নেয়া হয়। এতে ঢাকা ওয়াসাকে ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি পরিশোধে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং বাস্তবায়নের পর তা চালু করতে না পারার মতো কারণে সংস্থাটির ব্যয় বেড়েছে। 

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ চাইলেই পানির দাম কমাতে পারে বলে মন্তব্য করছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌তাকসিম এ খানের সময়ে ওয়াসায় যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে সেগুলো আগে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। তারপর বোঝা যাবে ওয়াসার প্রকৃত ব্যয় কত। ওয়াসাকে স্বচ্ছ-জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তাহলে পানির দাম কমানো সম্ভব।’

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রথমবারের মতো নিয়োগ পান তাকসিম এ খান। এরপর ছয় দফায় তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে সপ্তমবারের মতো ওই পদে আরো তিন বছরের জন্য নিয়োগ পান তিনি। 

ওয়াসায় এমডি পদে তাকসিম এ খানের নিয়োগ পাওয়া নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। সংস্থাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, পানিসংক্রান্ত কাজে ন্যূনতম ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ পেয়ে যান তাকসিম এ খান। লিখিত পরীক্ষায় পর্যাপ্ত নম্বরও পাননি তিনি। পরে ভাইভা বোর্ডে ২০-এ ২০ পেয়ে তিনি ওয়াসার এমডি হয়ে যান। ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে মাসে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নিতেন তিনি। প্রথম ১৪ বছরে বেতন-ভাতা হিসেবে ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এছাড়া আরো নানা বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন তিনি।

আরও