কোথাও ভবন না থাকায় গোলপাতার অস্থায়ী ছাউনিতে, আবার কোথাও ফাটল ধরা পরিত্যক্ত ভবনে আতঙ্ক নিয়ে চলছে পড়ালেখা। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে শ্রেণীকক্ষে, ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা। ফলে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। এরই মধ্যে ২০০টি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।
সরজমিনে দেখা যায়, দূর থেকে দেখলে মনে হবে লম্বা একটি পরিত্যক্ত খামার ঘর। তবে কাছে গেলেই দেখা যায় জরাজীর্ণ-ঝুঁকিপূর্ণ গোলপাতা ছাউনির শ্রেণীকক্ষে চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান। তিন বছর ধরে এভাবেই গোলপাতা ও পলিথিনের ছাউনিতে মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম তেলিগাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আতঙ্ক নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন শিক্ষকরা। উপজেলার ঢুলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও একই রকম। কোনো বিদ্যালয়ের ভবন নেই, কোনোটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, কোথাও ভবনের পিলারে রয়েছে বড় বড় ফাটল, আবার কোনো বিদ্যালয়ের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। একটু বৃষ্টি হলেই পরিত্যক্ত ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে।
পশ্চিম তেলিগাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার বলে, ‘বৃষ্টি পড়লেই আমাদের বই-খাতা ভিজে যায়। আমরাও ভিজে যাই। বই-খাতা নিয়ে লাইব্রেরিতে চলে যেতে হয়। গরমে আমরা ক্লাস করতে পারি না, খুবই কষ্ট হয়।’
জুয়েল নামে আরেক শিক্ষার্থী বলে, ‘আমাদের খুব কষ্ট হয় এ ক্লাসে পড়াশোনা করতে। ক্লাসের পাশে বেড়া নেই, বৃষ্টি হলেই ঝরঝর করে পানি পড়ে। কারেন্ট নেই, ফ্যান নেই। আমরা কীভাবে ক্লাস করব? আমাদের একটা ভবন দরকার।’
১৯০ নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়টির অবস্থা খুবই নাজুক। বৃষ্টি হলেই ক্লাসে পানি পড়ে। এতে ক্লাস বন্ধ করে দিতে হয়। বৃষ্টি থেমে গেলে আবার শুরু করতে হয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ক্লাস করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে গোলপাতার ঘরটি নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছি। এছাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আছে। ছয় পোস্টে তিনজন শিক্ষক দিয়ে ৯৭ শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে। ফলে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমার দাবি, একটা নতুন ভবন নির্মাণ করে দেয়া হোক। আপাতত সংস্কার করার জন্য একটা বরাদ্দ দেয়া হোক।’
একই ইউনিয়নের ২৪৬ নং পশ্চিম ঢুলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও একই রকমের। সেখানকার পরিত্যক্ত ভবনের পিলারে বড় বড় ফাটল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই পরিত্যক্ত ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ঝুঁকি আর আতঙ্কের মধ্যেই এসব ভবনে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তোহিফুর রহমান বলেন, ‘এখানে একসময় অনেক ছাত্রছাত্রী ছিল। ইউনিয়নের মধ্যে এ স্কুল বৃত্তিতে ফার্স্ট হতো। এখন এ স্কুলে ছাত্রছাত্রী আসে না। ভবন না থাকার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ নেই। এ ভবনের জন্য সব দপ্তরে চিঠি দেয়া আছে। ’
মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দুর্বল ও সংকট রয়েছে। এগুলোর দ্রুত সংস্কার ও ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা কমিটির সভায় রেজল্যুশন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অবকাঠামোগত সংকট থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ হলে সংকট সমাধান হবে।’
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার চিতলমারী উপজেলায় ৩৭টি, মোল্লাহাটে ১১, রামপালে ১৩, মোংলায় ২, ফকিরহাটে ৩০, মোরেলগঞ্জে ৩৪, শরণখোলায় ১১, কচুয়ায় ১২ ও বাগেরহাট সদরে ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নেই।
বাগেরহাট সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান জুয়েল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় ১ হাজার ১৬২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২০০টিতে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’