আপনাদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেমন ব্যবসা করছে, কেমন সম্ভাবনা দেখছে?
ধন্যবাদ। আমরা মূলত বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নিউভিশন সলিউশনস লিমিটেডের মাধ্যমে বাংলাদেশে আগ্রহী জাপানি ও অন্যান্য বিদেশী কোম্পানিকে পরামর্শসেবা দিয়ে থাকি। পাশাপাশি নিউভিশন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে জাপানি নির্মাণ প্রকল্পে নকশা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা এবং নির্মাণকাজে সম্পৃক্ত রয়েছি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আমাদের কিছু কার্যক্রম আছে। এছাড়া আমি ক্রিমসন কাপ এবং গিঞ্জা নামের একটি ফিউশন রেস্তোরাঁর সঙ্গেও যুক্ত।
বিভিন্ন খাতে আমাদের কার্যক্রম থাকায় সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের পরিবর্তনও আমরা সরাসরি অনুভব করি। গত সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ায় আমাদের ব্যবসায়ও কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়তে দেখছি। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে এবং বিদ্যমান কার্যক্রম সম্প্রসারণেও আগ্রহ দেখাচ্ছে। সেদিক থেকে আমরা আশাবাদী যে সামনে আমাদের ব্যবসায়ও আরো ইতিবাচক গতি আসবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ‘ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর হয়েছে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য কী?
জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। এর আগে শুধু ভুটানের সঙ্গে আমাদের একটি ‘প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (পিটিএ) ছিল। তবে জাপানের সঙ্গে আমাদের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এ চুক্তির জন্য জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই) থেকে আমরা প্রায় চার বছর আগে থেকেই কাজ করছিলাম। এটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর এখন দুই দেশের সরকারকেই নিজ নিজ পার্লামেন্টে এটি অনুসমর্থন করতে হবে। আশা করছি, এ বছরের শেষ নাগাদ প্রক্রিয়াটি বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাবে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে যদি আমরা আরো তিন বছরের সময় বর্ধিতকরণ পাই, তবে এ মুহূর্তে ইপিএ করে কী লাভ হলো? আসলে জাপানের অন্যান্য দেশের সঙ্গে করা ইপিএগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চুক্তি স্বাক্ষরের এক-দুই বছরের মধ্যেই সেসব দেশে জাপানি বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ হলো, ইপিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। ফলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হন যে এ দেশের সঙ্গে যেহেতু ইপিএ রয়েছে, তাই তাদের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ। সেটি মেধাস্বত্ব (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) রক্ষাসংক্রান্ত বিষয় হোক কিংবা বিনিয়োগজনিত কোনো সমস্যার সমাধান, সব ক্ষেত্রেই একটি আইনি নিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই ইপিএর প্রভাব সব সময়ই ইতিবাচক হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাপানে আমাদের প্রধান রফতানি পণ্য হলো তৈরি পোশাক। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা সেখানে জিএসপি সুবিধা পাব কিনা তা নিয়ে একটি শঙ্কা থাকে। কিন্তু ইপিএ কার্যকর থাকলে যতদিন এ চুক্তি বহাল থাকবে, ততদিন আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ থাকবে না। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এ চুক্তিতে জাপানের সুবিধা কী? আমরা জাপান থেকে প্রচুর গাড়ি এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি ও মেশিনারি আমদানি করি। ইপিএর আওতায় এ পণ্যগুলোর আমদানি শুল্ক আগামী ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। অর্থাৎ চুক্তি আজ সই হলো আর আগামী বছর থেকেই সব শুল্ক উঠে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়। এর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
এ চুক্তির সুফল যদি আমরা আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে পেতে চাই, তাহলে আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলো কী হওয়া উচিত?
জাপান এর আগেও প্রায় ২১টি ইপিএ করেছে। যখন তারা সেগুলো করেছে, তখন কিছু কিছু দেশের অবস্থাও হয়তো বাংলাদেশের মতো এলডিসি উত্তরণ পর্যায়ে ছিল। আমরা যখন ইপিএ করেছি, তখন আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল জাপানে তৈরি পোশাকের রফতানি বাড়ানো। এখন যদি কোনো কারণে ২০২৯ পর্যন্ত এলডিসি সুবিধা থাকে, তবুও আমরা ইপিএর সুবিধা ধীরে ধীরে পেতে থাকব। এটা একটা বড় বিষয়।
ইপিএতে অনেক সুবিধার কথা লেখা আছে। কিন্তু সেগুলো ব্যবসায়ীদের কাজে লাগাতে হলে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। কোম্পানির ভেতরে কিছু স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে সরকারের নীতিগুলোও ইপিএর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটা দেখার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি জেবিসিসিআই থেকে একটি প্রতিনিধি দল বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। সেখানে আলোচনায় ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, আর্থিক বিধিনিষেধ, নীতির পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং আরজেএসসির সংস্কারের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর মধ্যে কোন সংস্কারটি সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের চেম্বারে যেহেতু বাংলাদেশ ও জাপানের অনেক যৌথ এবং একক কোম্পানি রয়েছে, তাই তাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করি। বর্তমানে বেশকিছু জাপানি কোম্পানি ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু নিয়ে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভ্যাট ও ট্যাক্সের অডিট। অনেক সময় বেশ পেছনের সময় (ব্যাকডেট) থেকে এই অডিটগুলো করা হচ্ছে, যা তাদের জন্য জটিলতা তৈরি করছে। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়গুলো নিয়েই বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি।
আমরা মনে করি, যেসব বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন, তারা যদি এখানে সন্তুষ্ট না থাকেন, তবে আমরা যতই রোডশো বা প্রচারণামূলক কার্যক্রম করি না কেন, তা আশানুরূপ ফল দেবে না। কারণ নতুন বিনিয়োগকারীরা এ দেশে আসার আগে এখানকার বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেই প্রথমে যোগাযোগ করেন। বর্তমান বিনিয়োগকারীরা যদি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পান, তবে তারা নিজেরাই আমাদের দূত হিসেবে কাজ করবেন এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসবেন। সেই তাগিদ থেকেই আমরা সবসময় বাংলাদেশে কার্যরত কোম্পানিগুলোর বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার এবং সেগুলো সমাধানের জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করি।
উল্লিখিত দুটি সমস্যা ছাড়াও কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন বন্দরে কাস্টমসের খালাস প্রক্রিয়া; কখনো সেখানে জটলা (কনজেশন) তৈরি হয়, আবার কখনো পণ্যের এইচএস কোড বা শুল্কায়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। আমরা চাই বর্তমান সরকারের আমলে এ সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো আরো সহজ ও গতিশীল করা হোক। অবশ্য সাম্প্রতিক বাজেটসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের আভাস মিলছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।
জেট্রোর জরিপে জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আগ্রহ দেখা গেলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জাপানি এফডিআই ৫০০ মিলিয়ন ডলারের নিচে। এ আগ্রহ ও বাস্তব বিনিয়োগ ব্যবধানের প্রধান কারণ কী?
যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের কথা বলা হচ্ছে, তা কিন্তু প্রকৃত চিত্র নয়। বাংলাদেশে জাপানের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ হলো জেটিআই (জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল), যার পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগ অন্য দেশের মাধ্যম হয়ে বাংলাদেশে আসায় তা সরাসরি জাপানি বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি। ফলে আমাদের এখানে জাপানের বিনিয়োগ আসলে ৫০০ মিলিয়ন ডলার নয়, বরং এটি অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার।
অবশ্য ২ বিলিয়ন ডলারও তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট একটি অংক। জাপান থেকে আমরা এখন পর্যন্ত ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জাইকা অনুদান ও ঋণ পেয়েছি, সেই তুলনায় এ বিনিয়োগ ১০ শতাংশেরও কম। সুতরাং বিনিয়োগ কেন কম এবং এটি কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিই আসল প্রশ্ন। কয়েক বছর ধরে আমরা এইড নির্ভরতা থেকে ক্রমান্বয়ে ট্রেডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ১০ বছর আগের ট্রেন্ড বা প্রবণতা যদি আমরা দেখি, তখন জাপানি বিনিয়োগ আসার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশের সস্তা শ্রম। সে সময় জাপানি কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এখানে পণ্য উৎপাদন করে তা বিদেশে রফতানি করা। তবে বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে জাপানি কোম্পানিগুলো এখন এ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতেই মূলত বাংলাদেশে নতুন নতুন কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করছে। শুধু উৎপাদন খাতই নয়, বিভিন্ন জাপানি সেবা খাতের (সার্ভিস) কোম্পানিও এখন বাংলাদেশে আসছে।
এখানে একটি বড় বিষয় হলো, জাপানের বেশকিছু বড় ট্রেডিং কোম্পানি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই এ দেশে কাজ করছে; যেমন মিৎসুই, মিৎসুবিশি এবং সুমিতোমো। দীর্ঘদিন ধরে এখানে থাকলেও বর্তমানে তাদের কার্যক্রমে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে তারা মূলত আমদানীকৃত পণ্যের বাণিজ্য পরিচালনা করত, কিন্তু এখন তারা বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ করছে এবং বাণিজ্য থেকে ক্রমান্বয়ে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দিকে এগিয়ে আসছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে আমাদের এ ২ বিলিয়ন ডলারের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ইপিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের বর্তমান ৪ বিলিয়ন ডলারের এ বাণিজ্য হয়তো ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে।
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, চায়না প্লাস ওয়ান কৌশল, জাপানের বিগ-বি উদ্যোগ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা কী?
বিগ-বি, ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিকের যে কথা বলা হচ্ছে, এগুলোর একদম মূল প্রকল্পই হচ্ছে মাতারবাড়ী ডিপ সি পোর্ট। এখানে যে গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে, এটা ২০৩০ সালের দিকে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এটা হলে আমাদের সামগ্রিক লজিস্টিকসে আমূল পরিবর্তন আসবে। আমাদের আশা, বন্দর চালু হলে যেহেতু সেখানে ১৮-১৯ মিটার ড্রাফট থাকবে, তাই অনেক বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে আসতে পারবে। যেসব জাহাজ আগে সিঙ্গাপুরে যেত, সেগুলো সরাসরি বাংলাদেশে আসবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটা অনেক দ্রুত এবং আরো কার্যকর হবে। এতে খরচ কমবে। বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারেও কম দামে পণ্য পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে জাপানের অগ্রগতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাংলাদেশে আরো বেশি জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আসার জন্যই আড়াইহাজারে বিএসইজেড, বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রায় এক হাজার একরের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। গত কয়েক মাসে এই জোনে বেশকিছু নতুন টেন্যান্ট এসেছে। সবাই জাপানি নয়। যেমন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এখন পর্যন্ত হয়েছে সিঙ্গারের। সবচেয়ে বড় প্লট তারা পেয়েছে। যদিও সিঙ্গার আসলে একটি তুর্কি কোম্পানি। তবে অনেক জাপানি কোম্পানিও আছে। কিছু জাপানি কোম্পানি এরই মধ্যে উৎপাদনে চলে গেছে। যেমন লায়ন কল্লোল উৎপাদনে আছে, সিঙ্গারও উৎপাদনে আছে। আর্ট নেচার নামে একটি কোম্পানি, যারা পরচুলা তৈরি করে, তারাও উৎপাদনে গেছে। আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা নির্মাণ করছে। টয় ম্যানুফ্যাকচারিং বে ইকোনমিক জোনে আছে। বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি, যারা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে আগ্রহী, তারা এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে তারা বিএসইজেডকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি অন্য কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চলও দেখছে।
ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ও দুর্বলতা কী?
ভিয়েতনাম অনেক আগেই ইপিএ করেছে, আসিয়ানে যুক্ত হয়েছে। ফলে তারা অনেক আগে থেকেই জাপানি বিনিয়োগ পাচ্ছে। ২৫-৩০ বছর আগে থেকেই তারা স্কুল-কলেজে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে জাপানি ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তারা অনেক বছর আগে থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করেছে। তাই জাপানের বিনিয়োগও তারা অনেক বেশি পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এখন ইপিএ করেছি। কিন্তু সফট স্কিলের জায়গায় আমরা অনেক দেরি করেছি। তবে দেশে জাপানি ভাষা শেখানো এবং জাপানে জনশক্তি রফতানির বিষয়ে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার গড় বয়স প্রায় ২৬ বছর। সেই জায়গা থেকে দেখলে ভিয়েতনাম বা অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা আরো আকর্ষণীয়। কিন্তু এখানে একটি কোম্পানি বা কারখানা স্থাপন করতে যে সময় লাগে কিংবা যতগুলো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়, প্রতি বছর যেভাবে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়, এসব ক্ষেত্রে আমরা ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ভিয়েতনামে এসব অনেক দ্রুত হয়। একটি লাইসেন্স দিয়েই তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করতে পারে; আমাদের যেখানে ১৯ বা ২০টি লাইসেন্স লাগে। তবে সরকার এবার বাজেটে বলেছে, একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সবকিছু ঠিক থাকলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধন করা যাবে।
জাপানে দক্ষ কর্মীর ক্রমবর্ধমান চাহিদার সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? এক্ষেত্রে সরকার, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের করণীয় কী?
জাপানে জনশক্তি পাঠানোর প্রথম শর্তই হচ্ছে জাপানি ভাষা ভালোভাবে শেখা। আর এটা করতে সময় লাগে। এছাড়া জাপানে জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের অনেক প্রতিযোগী দেশ রয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে এখনো অনেক বেশি মানুষ যাচ্ছে। এমনকি নেপাল থেকেও তারা নিচ্ছে। ভিয়েতনামে জাপানি ভাষার দক্ষতার যে বিভিন্ন স্তর আছে, যেমন এন-ফাইভ, এন-ফোর, এন-থ্রি, এন-টু, সবচেয়ে ভালো এন-ওয়ান, সে পর্যায়ের মানুষ অনেক রয়েছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ায় এন-ওয়ান বা এন-টু দক্ষতাসম্পন্ন অনেক মানুষ পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা।
আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে কোন পরিবর্তনটি দেখলে আপনি বলবেন, এটি ইপিএর ইতিবাচক ফল?
২০৩৫-৩৬ সালের দিকে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কোন পর্যায়ে পৌঁছবে এবং তার সামগ্রিক রূপ কেমন হবে সেটি নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ করবে। ততদিনে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। মাথাপিছু আয় হয়তো ৭ বা ৮ হাজার ডলার অতিক্রম করবে। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো বলতে পারব যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কিংবা ইপিএ স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মেট্রোরেলসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পও আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাপান বর্তমানে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যে বিনিয়োগ করছে তার সুফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার আরো শক্তিশালী হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত বাড়বে, জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণও তত বৃদ্ধি পাবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ জনশক্তি। বর্তমানে আমরা প্রধানত কম দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠাচ্ছি। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে আমাদের কর্মীরা আরো উচ্চ দক্ষতার কাজে যুক্ত হতে পারবেন। এতে তাদের আয় বাড়বে এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সব মিলিয়ে আমি ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী, সম্ভাবনাময় ও বিনিয়োগবান্ধব একটি বাংলাদেশ দেখতে পাচ্ছি।