যদিও চাহিদার লাগাম টেনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এ নীতি সফল হয়নি। উল্টো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। জিনিসপত্রের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামীকাল শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রযোজ্য এ মুদ্রানীতি আজ ঘোষণা করা হবে।
নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার জন্য আজ বেলা ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সভাপতিত্ব করবেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এটি তার প্রথম মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা জানান, বরাবরের মতো নতুন মুদ্রানীতিরও প্রধান লক্ষ্য হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরা হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার (রেপো রেট) অপরিবর্তিত থাকবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্নে (৪ শতাংশে) নেমে এসেছে। উচ্চ সুদহার বজায় রেখে এ প্রবৃদ্ধি তথা উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের বাস্তবায়ন নিশ্চিতে জোর দেয়া হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতি এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঘোষিত মুদ্রানীতি তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। মুদ্রানীতিতে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেগুলোও অর্জিত হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সরকারকেই এখন মূল ভূমিকা রাখতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। সেটি হলে বিরাজমান মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত কয়েক বছরে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হাতিয়ার হলো সুদহার বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছর এ নীতির প্রয়োগ করেছে। কিন্তু ফলাফল একেবারেই সন্তোষজনক নয়। এটি পরীক্ষিত যে তিন-চার বছর ধরে বাংলাদেশে এ নীতি ব্যর্থ হয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব নীতি, বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার লাগবে। অন্যথায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মুদ্রানীতি কোনো কাজে আসবে না। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে।’
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জিত না হয়ে উল্টো মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গত মাসে (মে) দেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। মার্চের পর থেকে টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও এ প্রবৃদ্ধির হার এখন ৪ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মে ও জুনে এ পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে নামলেও সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এপ্রিলে এ ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এরপরের দুই মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা আরো বেড়েছে। যদিও ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। ঘোষিত এ বাজেট গতকাল জাতীয় সংসদে পাসও হয়েছে। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের ঘোষিত এসব লক্ষ্য অর্জনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার (বর্তমানে ১০ শতাংশ) কমানোর সম্ভাবনা নেই। বেসরকারি খাতকে প্রাণবন্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এটি বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে বিশেষ জোর দেয়া হবে।’