এ ঘটনার পর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। সুইফট নিজেও তাদের ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনে। এবার বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফটের সুরক্ষায় যুক্ত করতে যাচ্ছে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস (এএমএল)। এ প্রযুক্তি সন্দেহজনক লেনদেন তাৎক্ষণাৎ স্থগিত করে দেবে। টুলস সক্রিয় থাকলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বাড়তি নজরদারি থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত এগিয়ে নিতে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের সুপারিশে এ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কক্ষের পরিবেশ ও নিরাপত্তাগত কিছু পরিবর্তনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, এএমএল টুলসের কাজ সুইফট সিস্টেমে আদান-প্রদান করা তথ্যের সত্যতা নিখুঁতভাবে যাচাই করা। ফলে যেকোনো ধরনের ভুয়া বা জালিয়াতিপূর্ণ তথ্য এ প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহজনক লেনদেন স্থগিত করা সম্ভব হয়।
গত বছর সুইফট সার্ভার অডিট করানো হয় নিরীক্ষণ প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি বাংলাদেশের মাধ্যমে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ১৫টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি সুইফট সুরক্ষায় বেশকিছু সুপারিশও করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সুইফট সুরক্ষায় অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস যুক্ত করা। কেপিএমজি বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইফট সিস্টেমের সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনা ছিল না এবং কোনো সমস্যা হলে আগের সিস্টেমে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তৈরি ছিল না। সেটি তৈরি করা হয়েছে। ফায়ারওয়াল রুলস এবং ভার্চুয়ালাইজেশন ডিজাইনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল না। সুপারিশের ভিত্তিতে সেটি পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন হয়েছে। প্রযুক্তিগত সম্পদের তালিকা আপডেট করা হয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের অ্যাকসেস বা প্রিভিলেজড অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রডাকশন রানবুক এবং সিস্টেম ডিকমিশনিং পলিসির ঘাটতিগুলো দূর করা হয়েছে।
কেপিএমজি বাংলাদেশের মেহেদী হাসান বণিক বার্তাকে জানান, তারা বেশ কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিয়মিতভাবে সেগুলো ফলোআপ করছেন।
এরই মধ্যে সুপারিশ অনুযায়ী অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তবে নতুন বাস্তবায়িত সুইফট সিস্টেম গো লাইভ হওয়ার পর অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস যুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তা না হলে বর্তমান সিস্টেমে বাস্তবায়ন করতে হলে দুটি লাইসেন্স নতুন করে কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকার আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য সুইফট ব্যবহার করে। সুইফটের নিজস্ব কিছু অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস রয়েছে। এগুলো মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে। প্রথম ধাপে ব্যাংকগুলো তাদের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গে সুইফটের স্ক্রিনিং টুলের এপিআই যুক্ত করে দেয়। ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট মেসেজ বা কাস্টমার ট্রান্সফার পাঠানোর আগেই সেটি সুইফটের ক্লাউড প্লাটফর্মে চলে যায়। দ্বিতীয় ধাপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা যাচাই হয়। এ ধাপে সুইফটের সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই মেসেজে থাকা প্রেরক, প্রাপক, ব্যাংকের নাম এবং দেশের তথ্য বিশ্বের প্রধান প্রধান নিষেধাজ্ঞা তালিকার সঙ্গে যাচাই করে। সর্বশেষ ধাপে রয়েছে অ্যালার্ট এবং হোল্ড সিস্টেম। যদি কোনো লেনদেন সন্দেহজনক মনে হয়, তবে টুলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ‘অ্যালার্ট’ তৈরি করে এবং লেনদেনটি সাময়িকভাবে আটকে দেয়। ব্যাংকের এএমএল কমপ্লায়েন্স অফিসার তখন ম্যানুয়ালি সেটি যাচাই করে ক্লিয়ারেন্স দিলে তবেই টাকা অন্য প্রান্তে পৌঁছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুইফটে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলসের জন্য যদি লোকাল টিম তৈরি করা যায় তাহলে সেটা সাসটেইনেবল হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনহাউজ টিম এবং তার সঙ্গে বাইরের কিছু বিশেষজ্ঞ নিয়ে তৈরি করা টিম। কিন্তু বিদেশ থেকে কিনে এনে বসিয়ে দিলে কতটুকু কাজ করবে, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এ টুলস শুধু যুক্ত করলেই হবে না, বরং এর নিয়মিত আপডেট করা প্রয়োজন হবে। বিশেষ মানি লন্ডারিংয়ের ধরন সময়ে সময়ে বদলায়। সে অনুযায়ী এ টুলসকে আপডেট করার প্রয়োজন হয়।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে করণীয় নির্ধারণে গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছিল। এ কমিটি সে বছর জুলাইয়ের প্রথম কর্মদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সার্ভার পরিদর্শন করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ কয়েকটি প্রকল্পের বিপরীতে আন্তর্জাতিক পেমেন্টের মাধ্যমে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে নেয়া হয় বলে জানিয়েছিল এ পর্যালোচনা কমিটি। সে সময় হ্যাকাররা দেশী প্রকল্পের বিল পরিশোধ দেখালেও টাকা বিদেশী অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফারের নির্দেশনা দেয়। এক্ষেত্রে সুইফটে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস যুক্ত থাকলে এ ধরনের লেনদেন আটকে যেত।
পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশেও উল্লেখ করা হয়, কারিগরি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সুইফটের জন্য অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস ব্যবহার করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা পর্যালোচনা কমিটির কাছে তাদের কারিগরি জনবল সংকটের কথা জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, একটি সুইফট ট্রানজেকশন সম্পন্ন করতে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বে একযোগে পাঁচজন দক্ষ কর্মকর্তা প্রয়োজন, এ বিবেচনায় সুইফট টিমের জনবলের আকার বাড়ানো যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়।
আর্থিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের জটিলতা এবং সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল এবং দেশের শীর্ষ আর্থিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় ‘এএমএল সলিউশন’ বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহারকে এখন আর কোনোভাবেই ঐচ্ছিক, দীর্ঘমেয়াদি বা বিলাসী বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং রিলেশনশিপ (সিবিআর) টিকিয়ে রাখতে এবং বৈশ্বিক রেটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এটি কেবল একটি সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশীয় ব্যাংক খাতের ক্ষুণ্ন হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঢাল।
পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গঠিত পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা সুইফট এবং সার্ভার পরিদর্শন করে কিছু সুপারিশ আমাদের দিয়েছিলেন। এর মধ্যে তারা সুইফটের সুরক্ষায় অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে সেটা কেনাও হয়েছে। যে সুপারিশগুলো তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন, সেগুলো এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। বাকি সুপারিশগুলোও দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।’