ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সংসদকেই সার্বভৌম হিসেবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু না থাকা এবং গণভোটের বিধান সংসদে পাস করানোর প্রক্রিয়াকে আমলে নিয়ে দলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি।
গতকাল সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনো ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেয়াবেন, সে বিধান করতে হবে।’
অন্যদিকে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে—উভয় শপথই নিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচিতরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্যরা গতকাল সকাল ১০টা ৪৩ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে শপথ গ্রহণ করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপির ২০৯ জন সংসদ সদস্য শপথ নেন। সেই সঙ্গে বিএনপি জোটের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বিজেপির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন শপথ নেন। শপথ শেষে রীতি অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
জাতীয় সংসদের সচিব কানিজ মওলা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। জাতীয় সংসদের সিনিয়র ইমাম কারি মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ এবং আবু রায়হান তিলাওয়াত করেন। এ সময়ে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শপথকক্ষে উপস্থিত দলীয় সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন যে তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। এ সময় তিনি সংবিধান অনুসরণের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পর তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেয়ার বিধান করা যাবে। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি এবং আশা করি সামনের দিনেও চলব।’
উল্লেখ্য, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ২০১১ সালে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর আদালত সেই ধারাটি বাতিল ঘোষণা করে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন। তবে আদালতের রায়ে গণভোটের বিধানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা জেনারেল ক্লজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ৬ ধারা অনুযায়ী কোনো আইনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে তা সংসদে পাস করানোর প্রয়োজন হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ‘গণভোট’ অধ্যায়ে এ বিষয়গুলো সরাসরি উল্লেখ করা আছে। সেই সঙ্গে ‘গণভোটের বিধানটি সংসদে উপস্থাপন করে পাস করানোর সুপারিশ’ যুক্ত করা আছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গতকাল দুপুর ১২টার পর জামায়াতের নবনির্বাচিত প্রার্থীরা প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে পৃথকভাবে এ দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এনসিপি সংসদ সদস্যরাও। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন তারা।