বিআরটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

ঢাকায় টেনে আনা হচ্ছে গাজীপুরের দুর্ভোগ?

দেশের ধীরগতির প্রকল্পগুলোর একটি গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি। পরিকল্পনা আর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে ২০১৭ সাল থেকে এ সড়ক ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকল্পটি। গাজীপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে বাসের জন্য বিশেষায়িত লেন তৈরির কাজ যখন শেষ দিকে, তখন প্রকল্পটি ঢাকার আরো ভেতরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি

দেশের ধীরগতির প্রকল্পগুলোর একটি গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি। পরিকল্পনা আর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে ২০১৭ সাল থেকে এ সড়ক ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকল্পটি। গাজীপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে বাসের জন্য বিশেষায়িত লেন তৈরির কাজ যখন শেষ দিকে, তখন প্রকল্পটি ঢাকার আরো ভেতরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেড। এজন্য সম্ভাব্য আটটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরো তিনটি সম্ভাব্য স্থান প্রস্তাব করেছে প্রকল্পটির অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এজেন্সি ফ্রান্সেস ডেভেলপমেন্ট (এএফডি)।

বিআরটি করিডোরটি তৈরি করতে গাজীপুর-বিমানবন্দর মহাসড়কে যে দীর্ঘ দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, সম্প্রসারণের মাধ্যমে সে দুর্ভোগ ঢাকার ভেতরে টেনে আনা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা আর সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বর্তমানে বিআরটি প্রকল্প এলাকায় সীমাহীন দুর্ভোগ। সম্প্রসারিত অংশেও যদি এসবের ছাপ থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়কের চেয়ে বেশি দুর্ভোগ হবে ঢাকায়।

নির্মাণাধীন গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি করিডোরটি ঢাকার আরো ভেতরে সম্প্রসারণের জন্য একাধিক কারণের কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর একটি বিমানবন্দর ইন্টারসেকশনে বিআরটি করিডোরের বাস ঘোরানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গার সংকুলান করতে না পারা। চালুর পর বিআরটি করিডোরে যেসব বাস চলবে, সেগুলো ঘোরানোর জন্য কুড়িল ফ্লাইওভার, কুর্মিটোলা ইউটার্ন, বনানী ওভারপাসের নিচের ইউটার্ন, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ী ইউলুপ, মহাখালী বাস টার্মিনাল ইউলুপ, নাবিস্কো ইউলুপ, সাতরাস্তা মোড় ও জাহাঙ্গীর গেট ইউটার্নকে বিবেচনায় নিচ্ছে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি। অন্যদিকে রুট বর্ধন করার শর্তে বিআরটি প্রকল্পে সম্পৃক্ত হয়েছে উন্নয়ন সহযোগী এএফডি। সংস্থাটি প্রস্তাব দিয়েছে বিমানবন্দর থেকে গুলিস্তান বা মিরপুর হয়ে গাবতলী কিংবা খিলগাঁও হয়ে রামপুরা পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের। 

বিআরটি প্রকল্পের বিকল্প ‘টার্ন অ্যাবাউট’ ও রুট সম্প্রসারণের বিষয়ে গত ১৮ মে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে একটি সভা হয়। সেখানে বিআরটি কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমানবন্দরের সামনের ব্যস্ত মোড়ে ঢাকা বিআরটির বাস ঘোরানো হলে ভবিষ্যতে ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই বাস ঘোরানোর জন্য নতুন একটি বিকল্প ‘টার্ন অ্যাবাউট’ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

সভায় কর্মকর্তারা আরো জানান, বিআরটির বিকল্প ‘টার্ন অ্যাবাউট’ চিহ্নিত করতে একাধিক সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছে কর্তৃপক্ষ। সে মোতাবেক একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যাত্রীদের সুবিধা, বাস ঘোরানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, মিক্সড ট্রাফিক লেনে গাড়ির চাপ ইত্যাদি বিবেচনায় রাখা হয়। সার্বিক দিক বিবেচনা করে আটটি স্থানকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনার জন্য সমীক্ষা চালানো হয়। একইভাবে বিআরটি রুট সম্প্রসারণের জন্য এএফডির শর্তের বিষয়টিও সভাকে অবহিত করা হয়।

রুট সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিআরটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রুট সম্প্রসারণের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এ সম্ভাব্য প্রস্তাবিত রুটগুলো পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন দেবে। ওই প্রতিবেদন, আমাদের নিজস্ব সমীক্ষা ও প্রকল্পের পরামর্শকদের নিয়ে সমন্বিতভাবে বিআরটির জন্য একটি সম্প্রসারিত রুট চূড়ান্ত করা হবে।’

প্রকল্পটির কাজ শেষ পর্যায়ে এসে রুট সম্প্রসারণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর থেকে বিআরটি ব্যবহার করে যেসব যাত্রী বিমানবন্দর পর্যন্ত আসবে, বাস্তবতা হলো তাদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য কিন্তু বিমানবন্দর নয়, ঢাকার ভেতরে। এএফডিরও রুট বর্ধন করার একটা শর্ত রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে আমরা রুটটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি।’ এক্ষেত্রে রুটের শেষ প্রান্তে বাস ঘোরানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মহাসড়ক বিভাগে অনুষ্ঠিত গত ১৮ মে সভায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বিআরটি রুট বেশি সম্প্রসারণ করলে এর সুনাম রক্ষা করতে পারবে না এবং বিআরটি করিডোর তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে না। রুট বাড়াতে হলে নতুন প্রকল্প নিয়ে ডেডিকেটেড লেনের মাধ্যমে করাই উচিত।’

বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকা বিআরটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন প্রকল্প নয়, এখন যে প্রকল্পটি চলমান তার মাধ্যমেই রুট সম্প্রসারণের কাজ করা হবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো আগে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ চালু করা। এরপর পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত অংশে আমরা বাস পরিচালনা শুরু করব।’ 

গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশে বিআরটি করিডোর নির্মাণকাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সম্প্রসারিত অংশটি ঢাকার ভেতরেও দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাজীপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে বিআরটির কাজ অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে হচ্ছে। এখানে পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। যদি প্রকল্পটি ঢাকার ভেতরে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একই বিষয়গুলো থেকে যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা ঢাকায় জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে।’ তাই জনদুর্ভোগ এড়াতে সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয় ২০১২ সালে। নকশা আর দরপত্রের কাজ শেষ করতেই চলে যায় পরের চার বছর। ২০১৭ সালে শুরু হয় পূর্তকাজ, যা এখনো চলমান। করিডোরটির কাজ বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।

আরও