শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার

গ্রাম ও শহরে বিদ্যমান উচ্চবৈষম্য

পাঁচ দশকের ব্যবধানে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বাংলাদেশের সফলতা ঈর্ষণীয়। ধারাবাহিকভাবেই উন্নতি হচ্ছে এ দুটি সূচকে। তবে শহর ও গ্রামে এক্ষেত্রে এখনো উচ্চমাত্রায় বৈষম্য রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও পিছিয়ে

পাঁচ দশকের ব্যবধানে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বাংলাদেশের সফলতা ঈর্ষণীয়। ধারাবাহিকভাবেই উন্নতি হচ্ছে এ দুটি সূচকে। তবে শহর ও গ্রামে এক্ষেত্রে এখনো উচ্চমাত্রায় বৈষম্য রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে অসমতা বিরাজমান থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০১৯ সালে মাতৃমৃত্যু হার যেখানে গ্রামে প্রতি লাখে ১৯২ জন সেখানে শহরে ১২৩ জন। অন্যদিকে পাঁচ বছরের নিচে প্রতি হাজারে শিশুমৃত্যু হার গ্রামে ২৯ জন হলেও শহরে এ হার ২৬ জন। এছাড়া প্রতি হাজারে এক বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হার গ্রামে ২২ ও শহরে ২০ জন। এছাড়া এক মাসের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হার গ্রামে ১৬ হলেও শহরে ১৫।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৪ জন। ২০১৫ সালে তা নেমে এসেছে ৩৮ জনে, ২০১৯ সালে  ২৮ জনে। তবে শহরের তুলনায় গ্রাম বেশ পিছিয়ে রয়েছে। যেমন ২০১১ সালে শিশুমৃত্যু হার শহরে ছিল ৩৯ আর গ্রামে ছিল ৪৭ জন। এ হার শহরে যেভাবে কমেছে, গ্রামে সেটির প্রভাব কিছুটা কম।

আবার প্রতি লাখ জীবিত জন্মের ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯ সালে ১৬৫ জনে নেমে এসেছে। ১৯৯৫ সালে প্রতি লাখে এ হার ছিল ৪৪৭ জন। তবে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এ অনুপাত অনেক বেশি। শহরে প্রতি লাখে ১২৩ জন হলেও গ্রামে এ হার এখন ১৯২ জন। ফলে প্রতি লাখ জীবিত জন্মের বিপরীতে গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা শহরের তুলনায় ৬৮ জন বেশি।

সম্প্রতি এসডিজি অর্জনে স্বাস্থ্য ও সেবা খাতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর।

তিনি বলেন, শহর-গ্রামের পাশাপাশি শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মানদণ্ডে ও সম্পদের মালিকানার ভিত্তিতেও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই এসডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির জন্য বরাদ্দ অর্থ দরিদ্র, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। সরকারি সেবার মান উন্নত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার পেছনে পরিবারের অর্থ ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় আমূল সংস্কার জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ করাটা জরুরি। পল্লী ও দুর্গম এলাকায় রোগীর অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো। সরকারি-বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাতৃস্বাস্থ্য বিভাগের সেবার মান আরো উন্নত করতে হবে। প্রসব সেবা প্রদানকারী কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অদক্ষতা ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসূতি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলো প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি। অর্ধেকের বেশি মায়ের মৃত্যু হয় এ দুটি কারণে। যদিও কোনোটাই এত জটিল সমস্যা নয়। রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি বন্ধ করার ওষুধ আছে। কিন্তু দেশের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি বন্ধ করার ওষুধ থাকে না। প্রয়োজনের মুহূর্তে এ দুটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পাওয়া যায় না বলে অনেক প্রসূতির মৃত্যু হচ্ছে। তাই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অক্সিটোসিন ও ম্যাগনেশিয়াম সালফেটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য) ডা. মো. শামসুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হারে গ্রামাঞ্চল শহরের তুলনায় পিছিয়ে আছে, এটা সত্য। তবে গ্রামের দিকেও আমাদের কার্যক্রম চলছে। কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে আমরা সব মাতৃস্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিচ্ছি। দুই কারণে মাতৃমৃত্যু হার বাড়ে। এ দুটো রোধে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে।

আরও