বোনদের ঠকিয়ে টাকা আত্মসাতের লোভে মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে হত্যা

রাত এগারোটার দিকে আব্দুল হালিম ঘুমিয়ে পড়লে মাসুদ তার হাত-পা চেপে ধরেন এবং রুবেল তাকে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর বাসায় থাকা ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হন মাসুদ।

বোনদের ঠকিয়ে ব্যাংক থেকে তোলা টাকা আত্মসাতের লোভে লোক ভাড়া করে বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে খুন করিয়েছে ছেলে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের (৭২) মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত শেষে এ তথ্য জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

আজ রোববার (১২ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিবিআই জানায়, মৃত্যুর দুই মাস আগে আব্দুল হালিমের ব্যাংক থেকে তোলা ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের লোভে ৫ লাখ টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করেন তার ছেলে এইচএম মাসুদ৷ বিভিন্ন আলামত ও বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডড্রাইভ (ডিভিআর) উদ্ধারের পর বিষয়টি নিশ্চিত হয় তদন্তকারী সংস্থা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ‘‌ভাড়াটে খুনি’ মো. রুবেল।

প্রসঙ্গত, গত ১ ফেব্রুয়ারি এনায়েতনগর ইউনিয়নের মাওলাবাজার এলাকায় নিজ বাসা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ৷ নিহত মুক্তিযোদ্ধার একমাত্র ছেলে মাসুদ (৪২) দাবি করেন, আগের রাতে তাদের বাসায় ঢুকে তার হাত, পা ও মুখ বেঁধে, বৃদ্ধ বাবাকে খুন করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে ডাকাত দল।

তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মাসুদের বক্তব্যে সন্দেহ হয় পুলিশের। ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রিজাউল হক বলেন, ডাকাতরা কীভাবে ওই বাসায় ঢুকেছে তা তার বক্তব্যে পরিষ্কার ছিল না।

তাছাড়া বাড়িতে চারটি সিসি ক্যামেরা থাকলেও মেশিন থেকে হার্ডড্রাইভ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ সে কারণে এ ঘটনাকে রহস্যজনক বলে জানিয়েছিলেন ওসি।

এ ঘটনায় ১ ফেব্রুয়ারি ফতুল্লা মডেল থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন নিহতের জামাতা৷ মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, নিহত আব্দুল হালিমের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বাদীর শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর শ্বশুর ও তার একমাত্র ছেলে মাসুদ ও তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মাওলাবাজারে নিজ বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ঘটনার দিন রাতে তিন অজ্ঞাত ব্যক্তি বাদীর শ্যালককে বেঁধে তার শ্বশুরকে হত্যা করে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। লুটের পর আসামিরা সিসিক্যামেরার হার্ডড্রাইভও খুলে নিয়ে যায়। পরে ডাকাতরা চলে গেলে ভাড়াটিয়াদের সহায়তায় দরজা খুলে বের হন এইচএম মাসুদ৷

পিবিআই পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি ছায়াতদন্ত করে পিবিআই। ১০ ফেব্রুয়ারি তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এসআই শাকিল হোসেন ও এসআই কামরুল হাসানকে নিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাজহারুল ইসলাম।

তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, নিহতের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ইজিবাইক চালক মো. রুবেলের (২৭)। কিন্তু ঘটনার দুদিন পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনার দিন রুবেলের উপস্থিতি ভুক্তভোগীর বাড়ির আশেপাশে পায় তারা। সন্দেহভাজন হিসেবে শনিবার বোনের বাসা থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে খুনের সঙে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন রুবেল। আদালতে স্বাকীরোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন তিনি।

রুবেলের দেয়া তথ্যের বরাতে পিবিআই জানায়, ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে নিজ পিতাকে হত্যার জন্য রুবেলকে ভাড়া করেন মাসুদ। ঘটনার দিন রাতে মাসুদের ফোন পেয়ে তাদের বাড়িতে যান রুবেল। রুবেলের জন্য বাসার কলাপসিবল গেট ও ফ্ল্যাটের দরজা আগে থেকেই খোলা রাখেন মাসুদ।

রাত ১১টার দিকে আব্দুল হালিম ঘুমিয়ে পড়লে মাসুদ তার হাত-পা চেপে ধরেন এবং রুবেল তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

আরও