দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের পুঁজিবাজার হিসেবে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই)। অথচ দেশের পুঁজিবাজারে ক্রমেই অবস্থান হারাচ্ছে সিএসই। পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনের মাত্র ৫-৬ শতাংশ আসে এ এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। গত এক বছরে সিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এত কম লেনদেন হওয়া স্টক এক্সচেঞ্জের নজির বিশ্বে বিরল।
সিএসইর গত পাঁচ অর্থবছরের গড় লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে মাত্র একবারই এক্সচেঞ্জটির দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিএসইর দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর পরের ২০২০-২১ অর্থবছরে লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এক্সচেঞ্জটিতে গড় সবচেয়ে বেশি ৫০ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল। এর পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় লেনদেন নেমে আসে ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে ৩১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক্সচেঞ্জটির দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি টাকা।
বিশ্বের স্টক এক্সচেঞ্জ ও ক্লিয়ারিং হাউজগুলোর অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে কাজ করে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেস (ডব্লিউএফই)। সংস্থাটির তথ্যানুসারে ২০২৪ সাল শেষে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দৈনিক লেনদেন ছিল কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জের—৬০ লাখ ডলার। এ সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৪১ লাখ ডলার। ডব্লিউএফইর ডাটাবেজে সিএসইর দৈনিক গড় লেনদেনের কোনো তথ্য নেই। তবে সিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক্সচেঞ্জটির দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়ায় ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩২ ডলারে (প্রতি ডলার ১১৮ টাকা ৯২ পয়সা ধরে)। এসব তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায় এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে দৈনিক লেনদেনের দিক দিয়ে সিএসইর অবস্থান সবার নিচে। এ সময়ে ভিয়েতনামের হো চিন মিন স্টক এক্সচেঞ্জে গড়ে ৬৫ কোটি ১২ লাখ ডলার ও পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে গড়ে ৮ কোটি ৬ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বাইরে আফ্রিকার অস্থিতিশীল দেশ তিউনিসিয়ার তিউনিস স্টক এক্সচেঞ্জেও গড় লেনদেন ছিল ২২ লাখ ডলার। একই সময়ে কেনিয়ার নাইরোবি সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জে ৩২ লাখ ডলার, নামিবিয়ান স্টক এক্সচেঞ্জে ১৫ লাখ ডলার এবং নাইজেরিয়ান এক্সচেঞ্জে দৈনিক গড়ে ৬২ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছে।
সিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে সিএসই নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। আমাদের এখানে সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় সিএসই গুরুত্ব পায়নি। তাছাড়া নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণেও এক্সচেঞ্জের উন্নয়নে সেভাবে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয়নি। ইকুইটির বিবেচনায় সিএসইর অবস্থান খুবই করুণ। এত কম লেনদেন মনে হয় আর কোথাও নেই। আমরা নিজেরাই ডিএসইর সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তখন আগ্রহ দেখানো হয়নি।’
সিএসইকে টেনে তোলার জন্য কিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে আমরা ইকুইটির পরিবর্তে ডেরিভেটিভস ও কমোডিটির মতো পণ্য চালুর মাধ্যমে এক্সচেঞ্জটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে আমরা কমোডিটি এক্সচেঞ্জের অনুমোদন পেয়ে গেছি। এক্ষেত্রে আমরা খুব দ্রুতই কমোডিটি এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। এর মাধ্যমে আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। বলতে পারেন যে কমোডিটি এক্সচেঞ্জই এখন সিএসইর আশার আলো।’
দুই দশক আগেও দেশের পুঁজিবাজারের লেনদেনের ১৫-১৬ শতাংশ ছিল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের। তবে ধারাবাহিকভাবে এক্সচেঞ্জটি দৈনিক লেনদেনে তার অবস্থান হারাতে থাকে। সর্বশেষ গত অক্টোবর শেষে সিএসইর গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। আলোচ্য মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে ৫১৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনে বর্তমানে সিএসইর অবদান ৩ শতাংশের মতো। এক্সচেঞ্জটির অবস্থান বর্তমানে এতটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে যে এটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে অংশীজনদের কেউ কেউ দেশের পুঁজিবাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় দুটির পরিবর্তে একটি এক্সচেঞ্জ রাখার মত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সিএসইকে ডিএসইর সঙ্গে একীভূত করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
স্টক এক্সচেঞ্জের মূল কার্যক্রম থেকে যে আয় আসে তা দিয়ে সিএসইর পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। ব্যাংকে রাখা এফডিআরের অর্থ থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর নির্ভর করে এর পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএসইর ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিচালন লোকসান হয়েছে। যেখানে আগের অর্থবছরে পরিচালন লোকসানের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পরিচালন লোকসানে থাকলেও এফডিআরের সুদের ওপর ভর করে সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরে ২৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট মুনাফা করেছে সিএসই। এর আগের অর্থবছরে এক্সচেঞ্জটির নিট মুনাফা হয়েছিল ৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতার কারণে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হতে হয়। মূলত এ বাধ্যতামূলক দ্বৈত তালিকাভুক্তির কারণেই সিএসইতে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হয়েছে। তা না হলে স্টক এক্সচেঞ্জটিতে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতো না বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জেরই সদস্যপদ রয়েছে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের পুঁজিবাজারের বিদ্যমান বাস্তবতা এবং ব্যবসার ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা হলে আলাদা দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ রাখার প্রয়োজন রয়েছে কিনা সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। বাজার শৃঙ্খলার বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারে।’
সিএসইর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এক্সচেঞ্জটির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৬৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সিএসইর ৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এর বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। এ বছরের জুলাইতে এক্সচেঞ্জটির পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে, ডিএসইতে ৩৫ শতাংশ শেয়ার ছেড়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে অনুমোদন চেয়েছে সিএসই। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক্সচেঞ্জটিতে ৩৩১টি কোম্পানি, ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ড, ১৬টি বন্ড, ২৩৫টি ট্রেজারি বন্ড তালিকাভুক্ত ছিল। তাছাড়া এক্সচেঞ্জটির এসএমই প্লাটফর্মে এ সময় ১৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত ছিল। সর্বশেষ গতকাল সিএসইর বাজার মূলধন ৬ লাখ ৯০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।