কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে জরুরি এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালে অত্যাধুনিক মেশিন থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের অভাবে তা বন্ধ রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা।
হাসনা বেগমের মেয়ে হাফসা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাইরে এ পরীক্ষা করাতে ৩০-৪০ হাজার টাকা লাগবে, যা আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব।’" হাফসার মতো এমন ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে ৮৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি ২০২১ সালে সেবা কার্যক্রম শুরু করে। তবে চালুর পাঁচ বছর পার হলেও জনবল ও ওষুধ সংকটে জীবনরক্ষাকারী আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ও এনআইসিইউ (নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ইউনিট দুটি আজ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি।
আধুনিক ভেন্টিলেটরসহ ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিটটি পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও মাত্র পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে প্রায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের এসব যন্ত্রাংশের পাশাপাশি কম্পিউটার ও অন্যান্য ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ এখন অকেজো হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে জেলার সংকটাপন্ন রোগী ও নবজাতকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য এখনো অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করে ছুটতে হচ্ছে বগুড়া অথবা ঢাকায়। এর জন্য রোগীদের বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে চিকিৎসাসেবায় ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলার ৩২ লাখ মানুষ।
হাসপাতালটিতে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও তা সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক এনজিওগ্রাম যন্ত্র স্থাপন করা হলেও দক্ষ জনবলের অভাবে তা সচল করা যায়নি। এদিকে হৃদরোগীদের সিসিইউ বিভাগ চালু থাকলেও ছয় মাস ধরে সেখানকার এসি বিকল। হাড়ের অস্ত্রোপচারের জন্য ৪ কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক ‘সিআরএম’ (ক্লোজড ম্যানুয়াল রিডাকশন) যন্ত্র থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। চক্ষু বিভাগে কয়েক কোটি টাকার অত্যাধুনিক ল্যাসিকস যন্ত্র টেকনিশিয়ানের অভাবে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ৪৫ লাখ টাকার ম্যামোগ্রাফি যন্ত্র। এছাড়া এমআরআই মেশিনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ১৬ কোটি টাকা জমা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা হাসপাতালে আসেনি। চালু করা যায়নি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার ও মানসিক রোগ বিভাগও।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চালুর জন্য প্রাথমিকভাবে ৭৫ জন সহকারী রেজিস্ট্রার পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ৫৮ জন। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৭৬টি পদের মধ্যে ৪৭টি শূন্য। ১৮৩ জন চিকিৎসক ও ৭৩ জন দক্ষ জনবলের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক হাজি মো. আব্দুস সাত্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন আগে সেবা কার্যক্রম চালু হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চালু না হওয়ায় এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। এটি নামেই শুধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে রয়েছে।’
নানা সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতালের উপসহকারী পরিচালক মো. ওয়াদুদ জানান, অনেক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও লোকবল ও ওষুধের অভাবে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। আইসিইউ ও এনআইসিইউ শুরু থেকেই বন্ধ রয়েছে। কিছু চিকিৎসক অনিয়মিত, তাদের নিয়মিত করার চেষ্টা চলছে।
সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম নুরুজ্জামান বলেন, ‘যে জনবল রয়েছে, তা দিয়েই আমরা অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি সচল রেখে সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে আইসিইউ এনআইসিইউসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট জনবল সংকটে চালু করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে, অনুমোদন পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’