দুই হাসপাতালে কার্যক্রম শুরু

স্বাস্থ্য খাতের নতুন চ্যালেঞ্জ কভিড ফলোআপ চিকিৎসা

কভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ভুগছেন নানা জটিলতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এ খাতে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে এখনই সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। যদিও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের ফলোআপ সেবা দিতে গত মাসের শেষদিকে মাত্র দুটি হাসপাতালে চালু হয়েছে ‘পোস্ট কভিড ক্লিনিক’। এর একটিতে সপ্তাহে তিনদিন ও অন্যটিতে সপ্তাহে দুদিন পাওয়া যাবে এ সেবা।

কভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ভুগছেন নানা জটিলতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এ খাতে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে এখনই সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। যদিও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের ফলোআপ সেবা দিতে গত মাসের শেষদিকে মাত্র দুটি হাসপাতালে চালু হয়েছে ‘পোস্ট কভিড ক্লিনিক’। এর একটিতে সপ্তাহে তিনদিন ও অন্যটিতে সপ্তাহে দুদিন পাওয়া যাবে এ সেবা।

কভিড আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এমন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুস্থ বলতে উপসর্গহীন অবস্থায় আছেন। কিন্তু শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল অনুভব করেন তারা। কাজে আগের মতো গতি পান না। শারীরিকভাবে এ শক্তিহীনতার ফলে মানসিক একটা চাপও অনুভব করেন তারা। এছাড়া কভিড নেগেটিভ হলেও অনেকেই এখনো ঘ্রাণশক্তি সেভাবে ফিরে পাননি, চোখে কম দেখছেন, অনেকে কানেও শুনছেন কম। মাংসপেশিতে ব্যথা অনুভব ছাড়াও আছে শারীরিক জড়তা। আর যাদের আগে থেকেই কো-মরবিডিটি (সহঅসুস্থতা) ছিল তাদেরও ওই সমস্যা আরো জেঁকে বসছে বলেও জানান অনেকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত দেশে কভিড সংক্রমিত হয়েছেন তিন লক্ষাধিক মানুষ। তার মধ্যে দুই লাখের বেশি লোক সুস্থ হয়েও উঠেছেন। এখন দেশে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা এক লাখের বেশি। তাদের চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল। কিন্তু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা দুই লাখের বেশি রোগীর অনেকেই ভুগছেন নানা জটিলতায়। তাদের জন্য কভিড-পরবর্তী ফলোআপ সেবা অপ্রতুল। তবে এ সেবা চালু করেছে দুটি প্রতিষ্ঠান; ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সংক্রমিত তিন লক্ষাধিক রোগীর দুই লাখের বেশি এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর বাইরে মৃত্যু রোগীদের সংখ্যা বাদ দিলে এখনো ১ লাখ ১ হাজার ১২ জনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সক্রিয় উপস্থিতি আছে। দেশে কভিড আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে শয্যা আছে মোট ১৪ হাজার ৪৭৪টি। এছাড়া আইসিইউ শয্যা আছে ৫৫০টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ১২৩ জন সারা দেশে অবস্থিত কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আক্রান্ত রোগীদের জন্য কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে সেবা নেয়ার সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত সুস্থ ২ লাখ ১৬ হাজার ৬১৫ জনের ফলোআপ সেবা নেয়ার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে এখন সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪ হাজার ১২৩ জন কভিড রোগী। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর হাসপাতালগুলোতে সক্রিয় রোগী ভর্তি আছেন ২ হাজার ২৮০ জন। চট্টগ্রাম মহানগরীর কভিড হাসপাতালে চিকিৎসারত আছেন ১৭৩ জন। বাকি ১ হাজার ৬৭০ জন সারা দেশের অন্যান্য কভিড হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্য রোগীরা অধিকাংশই বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। সংক্রমণের ছয় মাস ছুঁই ছুঁই এ অবস্থায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থ হয়েছেন প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী। সুস্থ হওয়া এ রোগীদের জন্য সেবা দিতে ঢামেক ও বিএসএমএমইউতে চালু হয়েছে কভিড ফলোআপ ক্লিনিক।

বিষয়টি নিয়ে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড পজিটিভ হয়ে সুস্থ হওয়া অনেকেই নানা জটিলতায় ভুগছেন। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এটা নতুন একটা চ্যালেঞ্জ। তার জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমরা এ ক্লিনিক চালু করেছি। সক্রিয় রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি সুস্থ রোগীদের ফলোআপ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসক বলেন, এরই মধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিএসএমএমইউতে পোস্ট কভিড ফলোআপ ক্লিনিক চালু করেছি। আপাতত আমরা সপ্তাহে দুইদিন সেবা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সেবার পরিসর কীভাবে আরো বাড়ানো যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। প্রাথমিকভাবে ইন্টারনাল মেডিসিন, রেসপিরেটরি মেডিসিন, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, মনোরোগবিদ্যাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর চেয়ারম্যানদের এ ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকার বাইরে কভিড ফলোআপ সেবা গ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঢাকার বাইরে এখনো এ সেবা চালু করেনি কোনো প্রতিষ্ঠান। অবশ্য কিছু হাসপাতালে কভিড রোগীদের সেবার অংশ হিসেবে কিছু ফলোআপ করা হচ্ছে। ঢাকায় এ সেবা দিচ্ছে যে দুই প্রতিষ্ঠান, তারাও সপ্তাহে মাত্র পাঁচদিন সেবা দিচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ৯টা থেকে ১২টা এবং বিএসএমএমইউতে শনি ও মঙ্গলবার ১১টা থেকে দুটি ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগে এ সেবা দেয়া হচ্ছে।

কভিড পজিটিভ হয়ে পরবর্তী সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের ফলোআপ সেবা নিয়ে গবেষণা এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, যেহেতু এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই, অন্যদিকে ভ্যাকসিনও আসেনি এখনো। এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হওয়া রোগীদের জটিলতার লক্ষণগুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

ফলোআপে দেরি করে ফেললে তাদের শারীরিক জটিলতা দিন দিন বাড়বে বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ। তবে যেহেতু আমরা এখনো নিশ্চিত নই, ঠিক কী কারণে, কোন ধরনের সমস্যা হচ্ছে, সেটা আগে নিশ্চিত হতে হবে। তার জন্য গবেষণা দরকার। তারপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুস্থ হওয়া রোগীদের ফলোআপ সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সুতরাং এখনই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আরও