ঢাকা মহানগর এলাকায় বাসের রুট পারমিট প্রদান করে আসছে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি। পদাধিকারবলে এ কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর পুলিশপ্রধান (ডিএমপি কমিশনার)। জানা যায়, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তিত হলে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কার্যকারিতা থাকবে না। অর্থাৎ ঢাকায় নতুন বাস নামানো এবং রুট পারমিট দেয়ার ক্ষেত্রে এখন পুলিশের যে ক্ষমতা আছে তা লুপ্ত হবে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের পেছনে পুলিশের অনাগ্রহের এটিই প্রধান কারণ বলে অভিযোগ করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস প্রবর্তনে ‘বাস পরিবহন সেবা পরিচালনা ও বিশেষ অধিকার (রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ) বিধিমালা’ শিরোনামের একটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল ডিটিসিএ। ২০২২ সালে এ বিধিমালার বিরুদ্ধে মতামত দিয়েছিল ডিএমপি। ওই চিঠিতে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির ক্ষমতা বলবৎ রেখে বিধিমালাটি প্রণয়নের সুপারিশও করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, বিধিমালাটি এখনো পাস হয়নি।
অতীতে বিভিন্ন সময় কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার একটি বড় উদাহরণ হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। পুলিশের এ সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার স্ত্রী আফরোজা জামান মৌমিতা ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড নামের একটি পরিবহন কোম্পানির চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে গুলশান চাকা নামে আরেকটি পরিবহন কোম্পানির পরিচালকও তিনি। আছাদুজ্জামান মিয়া যখন ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন তখন ঢাকায় পরিবহন ব্যবসা করেছেন তার স্ত্রী। আছাদুজ্জামান মিয়া ছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন স্তরের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদ্ধতিতে নামে-বেনামে ঢাকার পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
রুট পারমিট দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের হাতে থাকার কারণেই সংস্থার সদস্যরা নামে-বেনামে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার শহরে নতুন বাস নামানো বা বাসের রুট পারমিট দেয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও পুরনো। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এ লেনদেনের সুবিধাভোগীও পুলিশ। মূলত এসব সুবিধার জন্যই পুলিশের অনেক কর্মকর্তা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির ক্ষমতা নিজেদের কাছে রাখতে চান এবং বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের বিরোধিতা করছেন।
কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের কাজে পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা এবং অনাগ্রহের অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. জিললুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন নিয়ে কিছুদিনের মধ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে সে অনুযায়ী আমরা কাজ করব।’
২০১৮ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত নেয়, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা (বাস রুট র্যাশনালাইজেশন) প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট প্রদান করা হবে না। এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সম্প্রতি বিভিন্ন কোম্পানির অনুকূলে ২১টি রুটে ২ হাজার ৬১৫টি বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি।
এছাড়া পুলিশের আরো কিছু কার্যক্রম কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানিয়েছেন ডিটিসিএর কর্মকর্তারা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাউন্টার ও ই-টিকিট পদ্ধতিতে বাস পরিষেবা প্রবর্তনের অংশ হিসেবে গোলাপি বাস সার্ভিস চালু করে পরিবহন মালিক সমিতি। গোলাপি বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিটিসিএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের জন্য ডিটিসিএ এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। একাধিক রুটে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালুও করা হয়েছে। বিভিন্ন রুটে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়েছে। কাজটি যখন একটি কাঠামোয় এসেছে তখন গোলাপি বাস প্রবর্তনসহ আলাদাভাবে বাস রুট করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যা আমাদের কাজের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।’
রাজধানী ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছিল ২০০৫ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি)। এর ১০ বছর পর ২০১৫ সালে ঢাকার তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক প্রথমবারের মতো কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০২১ সালে একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেয় ডিটিসিএ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন মালিকদের আপত্তি আর পুলিশের ‘অনাগ্রহে’ উদ্যোগটি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।
যদিও মালিকরা কোম্পানিভিত্তিক বাস প্রবর্তন উদ্যোগের ব্যাপারে আন্তরিক বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন। এ কাজে পুলিশের অনাগ্রহের বিষয়টিও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাস মালিকরা শুরুতে আপত্তি করলেও এখন তারা বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের প্রতি আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন। এসব কাজে পুলিশও আমাদের সহযোগিতা করছে। ডিটিসিএর যে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাস হয়নি, তা পুনর্বিবেচনার জন্য আবার পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’
ঢাকার পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অনেকগুলো সংস্থার ওপর থাকায় এ সমস্যাগুলো হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখানে পরিবহন নিয়ে চার-পাঁচটি মন্ত্রণালয় কাজ করে। এতগুলো সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করা কঠিন। পরিবহন সম্পর্কিত কাজগুলো একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের কাজগুলো সহজ হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশের মতো গণপরিবহনের রুট পারমিট পদ্ধতি পৃথিবীর কোথাও নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো বাস চলার অনুমতি দেয়ার আগে তার চাহিদা আছে কিনা, কোথায় স্টপেজ দিতে হবে, কত সময় পর পর বাস চলাচল করবে—এ কাজগুলো বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে করতে হয়। পুরো পৃথিবীতে এ কাজগুলো করার জন্য গণপরিবহন সম্পর্কিত পেশাদারদের নিয়ে ম্যাস ট্রান্সপোর্টেশন ইউনিট করা হয়। অথচ আমাদের দেশে এ কাজগুলো করছে পুলিশ। তাদের সঙ্গে রয়েছে কিছু পরিবহন মালিক আর সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদ।’
তিনি আরো বলেন, ‘রুট পারমিট দেয়ার কাজটি করার জন্য পুলিশের কাছে কোনো মডেল নেই। পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিকভাবে তারা রুট পারমিট দেয়। এটার সঙ্গে পুলিশের স্বার্থ জড়িত। পরিবহন মালিকদের স্বার্থ জড়িত। রুট পারমিটের নামে এখানে কোম্পানির ব্যানার কেনাবেচা হয়। এ কারণে পুলিশ রুট পারমিট দেয়ার কাজটি ছাড়তে চাইছে না।’
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সেবাগ্রহণকারী তথা জনগণের প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনসাধারণ এ সেবা নিয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও তাদের অংশগ্রহণ এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় জনপ্রতিনিধিদের রাখা উচিত। কোন রুটে কী ধরনের পরিবহন প্রয়োজন, কী পরিমাণ প্রয়োজন—এমন বিভিন্ন জনচাহিদা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তুলে ধরা অধিকতর সহজ হবে। তবে এর সঙ্গে অন্য অংশীজনদেরও রাখতে হবে।’
প্রসঙ্গত, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা প্রবর্তনের লক্ষ্যে একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পটি সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল ডিটিসিএ। তবে পরিকল্পনা কমিশন মেয়াদ বাড়ায়নি। ফলে মাঝপথে এসে বন্ধ হয়ে গেছে প্রকল্পটি। ঢাকায় বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের জন্য ২০১৮ সালে একটি কমিটি গঠন করে দেয় তৎকালীন সরকার। সম্প্রতি এ কমিটিও বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস প্রবর্তনের জন্য যে দুটি সরকারি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, বর্তমানে তার একটিও কার্যকর নেই। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাস মালিকদের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিনেও এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের অনাগ্রহ ও অসহযোগিতার কারণেও প্রকল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।