মোমেন সরদার

'পাকবাহিনীর নৃশসংতা দেখে নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি, যোগ দিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে'

মুহূর্তের মধ্যে পুরো গোবিন্দকাটি গ্রাম ঘেরাও করে ফেলে ৬০ থেকে ৭০ জন হানাদার। একপর্যায়ে গোবিন্দকাটি মাঠে জড়ো হওয়া সব নারী ও পুরুষকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করে। গুলিতে মায়ের কোলে থাকা শিশুদেরও ঝাঁঝরা হতে দেখেছি।

সাতক্ষীরার মোমেন সরদারের বাবা ছিলেন মুসলিমের লীগের সদস্য। আর তাই তার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া সহজ ছিল না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক ঘটনা যখন পরিবারের পিছুটান উপেক্ষা করে রণাঙ্গনে ছুটে গিয়েছেন তিনি। বণিক বার্তার কাছে রণাঙ্গনের সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন মোমেন সরদার-

চোখের সামনে প্রায় ৪৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে ব্রাশ ফায়ারের মাধ্যমে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যার সে দৃশ্যগুলো মনে পড়লে আজও আঁতকে উঠি।

দিন তারিখ মনে নেই, তবে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের কোনো এক দিন। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যশোর জেলার কেসবপুর, ছিনব্বইগ্রাম ও মঙ্গলকোট এলাকার প্রায় ৫‘শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু জড়ো হয় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গোবিন্দকাটি ব্রিজ সংলগ্ন একটি মাঠে। রাতেই তারা সাতক্ষীরার কোনো এক সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাবে ভারতে। কিন্তু এ খবর রাজাকারদের মাধ্যমে জেনে যায় পাক সেনারা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো গোবিন্দকাটি গ্রাম ঘেরাও করে ফেলে ৬০ থেকে ৭০ জন হানাদার। একপর্যায়ে গোবিন্দকাটি মাঠে জড়ো হওয়া সব নারী ও পুরুষকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করে। গুলিতে মায়ের কোলে থাকা শিশুদেরও ঝাঁঝরা হতে দেখেছি।

মূলত সেই বর্বর হত্যাকাণ্ড দেখেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকি। পরবর্তীতে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের রাজনৈতিক মতাদর্শও আমাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে।

তখন মাধ্যমিক পড়ি, বাবা মুসলিম লীগ করতেন। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটা আমার জন্য কঠিন ছিল। গোপনে খোঁজ করতে থাকি কার সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারব। অবশেষে কলারোয়া থানার তৎকালীন প্রাদেশিক এম এল এ মমতাজ উদ্দিনের শরণাপন্ন হই। তিনি আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগ্রহ দেখে আমাকে ৮ নম্বর নিয়ে যান। ভারতের হাকিমপুরে ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মঞ্জুর ও সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপটেন শফিউল্লার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দেন। এরপর সেখানে ১ মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তীতে ভারতের বিহারে গিয়ে আরো প্রায় ১ মাস গেরিলা প্রশিক্ষণ নেই।

নভেম্বরের শেষের দিকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপটেন শফিউল্লার নেতৃত্বে আমরা ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রথম কলারোয়ার বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেখানে টানা ৪ থেকে ৫ দিন চলে যুদ্ধ। চোরাগুপ্ত হামলার মাধ্যমে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ পাক সেনাকে হত্যা করি। যার পুরোটাই ছিল গেরিলা হামলা আর গেরিলা হামলার নকশা দিয়েছি আমি। অধিকাংশ হামলা আমরা রাতেই করেছি। তবে পাক সেনাদের হাতে বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধে ২৫ থেকে ৩০ মুক্তিযোদ্ধাও মৃতুবরণ করে। এছাড়াও আরো অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধে অংশ করেছিল।

আরও