বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগীদের মাঝে আশা জাগিয়েছিল ৯৪ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মীয়মান বিশেষায়িত হাসপাতাল। শর্ত ছিল ২০২৩ সালের মধ্যেই শেষ করতে হবে ৪৬০ শয্যা হাসপাতালটির নির্মাণকাজ। প্রায় এক বছর হলো শেষ হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ। এ সময়ের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। অবশ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বিল্ডার্স লিমিটেড ও মেসার্স খান বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষের দাবি অর্ধেকের বেশি কাজ শেষ হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ বরাদ্দ না থাকার পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধে দেরির কারণেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গতি হারাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে প্রায় আট মাস আগে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৬ সালের আগে প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিশেষায়িত হাসপাতালটির জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে জমি নির্বাচন করা হয়। সেখানে পরিত্যক্ত পুকুর ভরাট করে তিন একর জমিতে ১৭ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে। নির্মাণকাজ পায় বঙ্গ বিল্ডার্স লিমিটেড ও মেসার্স খান বিল্ডার্স। চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সময় বেঁধে দেয়া হয় ২০২৩ সাল পর্যন্ত। সে হিসাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় আট মাস আগে। গত আড়াই বছরে কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দাবি, হাসপাতালের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়েনি। তবে সরকারি প্রকল্পটি সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঠিকাদার এ পর্যন্ত যে কাজ করেছে তার বিল এখনো পরিশোধ করা যায়নি। এখনো তারা ১৬ কোটি টাকা পাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হতে এখনো দুই বছর সময় লাগবে। তাই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরই নতুন করে দুই বছর সময় বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয় আবেদন পাঠানো হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন হয়নি।’ তবে শিগগিরই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ করাও সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের দুই তলা বেজমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। ছয়তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজও শেষের পথে। প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন প্রকল্পটিতে। তবে আগে এ সংখ্যা ছিল ২২৫-২৫০ জন। বেশি শ্রমিক দিয়ে কাজ করা গেলে গত বছরের জুনের মধ্যেই ১০ তলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল বলে দাবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার রিপন তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বরাদ্দ না থাকায় তা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, কাজের অর্ধেক শেষ করেও এখন পর্যন্ত আমরা বিল পেয়েছি মাত্র ২৫ শতাংশের। সরকারের কাছে এখনো ২০ কোটি টাকা পাব। বিল না পেলে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার পরও কমসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।’ তবে এভাবে আর কতদিন চালিয়ে নেয়া যাবে, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন বিভাগে আটটি সমন্বিত বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে বরিশালে নির্মাণ করা হচ্ছে ৪৬০ শয্যা হাসপাতাল। নির্মীয়মান হাসপাতালটির ছয়তলা পর্যন্ত ১০০ শয্যার ইউনিট থাকবে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য। বাকিগুলোয় কিডনি ও হৃদরোগসহ অন্যান্য বিভাগ থাকবে। বরিশালের বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসায় ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। ২০২০ সালের ২৯ জুলাই দরপত্র আহ্বান করে গণপূর্ত বিভাগ। ওই বছরের নভেম্বরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে।
গবেষণাপত্র বলছে, বছরে অন্তত তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তাদের বড় একটি অংশ চিকিৎসার বাইরে থেকে যায় অর্থের অভাবে। বছরে এ রোগে মারা যায় এক লাখেরও বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের। তাই এ অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজ ও যুগোপযোগী করে তুলতে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি সচেতন নাগরিকদের।