কনস্টেবল মো. শহিদুল আলম যুক্ত ছিলেন ট্রাফিক বিভাগে। ৪ আগস্ট রাতে ডিউটি শেষে বাসায় ফেরেন। পরদিন সকালে আবার উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে যুক্ত হন। ঘণ্টা খানেক ডিউটি করার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কল পেয়ে ছুটে যান উত্তরা পূর্ব থানার সামনে। সেখানে জনরোষের শিকার হয়ে মৃত্যু হয় তার। শুধু তিনি নন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচ্চাভিলাষের বলি হয়েছেন ৪৪ পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই কনস্টেবল থেকে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদার। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে পুলিশের কার্যক্রম শুরু হলেও অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করতে চাচ্ছেন না মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘাত-সংঘর্ষ ও জনরোষের শিকার হয়ে বিভিন্ন পদমর্যাদার ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন কনস্টেবল, একজন নায়েক, ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), আটজন এএসআই, তিনজন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জন নিহত হয়েছেন ৫ আগস্ট। ১৪ জন নিহত হয়েছেন ৪ আগস্ট এবং বাকি সদস্যরা আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন সময় নিহত হন। নিহত সদস্যদের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ১৪ জন, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৫, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার দুই, কুমিল্লার তিতাস থানার দুই, চাঁদপুরের কচুয়া থানার এক, হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার এক, ঢাকার বিশেষ শাখার (এসবি) এক, নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক, ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের এক, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের এক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার এক, খুলনা মহানগর পুলিশের এক, গাজীপুর মহানগর পুলিশের এক ও ঢাকা জেলার দুজন রয়েছেন।
পুলিশের তথ্যমতে, জনরোষের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন এনায়েতপুর থানায়। অসহযোগের প্রথম দিন ৪ আগস্ট ১৩ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। সেদিন সকাল ১০টায় এনায়েতপুরের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করেন। আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। বেলা ১টার দিকে এনায়েতপুর থানায় একটি মিছিল প্রবেশের চেষ্টা করে। পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করার এক পর্যায়ে থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সেই আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা একে একে বের হতে থাকলে তাদের পিটিয়ে, মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়। হত্যার পর এক পুলিশ সদস্যের গলায় ফাঁস দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখার ছবিও প্রকাশ পেয়েছে। তিনজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে রাখা হয়। হত্যা করে আট পুলিশ সদস্যকে স্থানীয় একটি মসজিদের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়। তাদের কয়েকজনের মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাদের গায়ের পোশাক খুলে ফেলা হয়। ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি জনরোষের শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। সেদিন সারা দেশে প্রায় ৪৫০ থানায় হামলা হয়। ডিএমপি উত্তরা পূর্ব থানা জনরোষের শিকার হয়। সেখানে মৃত্যু হয় পাঁচ পুলিশ সদস্যের। একই দিন যাত্রাবাড়ী থানার সামনে জনরোষের শিকার হয়ে মারা যান আট পুলিশ সদস্য।
পুলিশের লোকবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক জনরোষের শিকার হওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচ্চাভিলাষকে দায়ী করেছেন নিহতের পরিবার ও বাহিনীর সাধারণ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, ৫ আগস্ট সকাল থেকে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বা এর ওপরের কোনো কর্মকর্তাকে মাঠে দেখা যায়নি। তারা কেবল নিরাপদ জায়গায় থেকে পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। বেতারযন্ত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে জনরোষের শিকার হন। কিন্তু পুরো আন্দোলন ঘিরে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা সেদিন সামান্য আহত হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আমার সহকর্মীদের অন্য কেউ হত্যা করেনি। পরোক্ষভাবে হত্যা করেছেন আমাদের বাহিনীর উচ্চাভিলাষী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা মাঠে না থেকেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। এজন্য আমরা জনরোষের শিকার হয়েছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে পুলিশের অন্তত ৪৫০ থানা হামলার শিকার হয়েছে। মারা গেছেন ৪৪ পুলিশ সদস্য। এছাড়া থানা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছে। আমরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি করার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে লুট হওয়া ৭৪৮টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ২০ হাজার ১৯৫ রাউন্ড গুলি, ১ হাজার ৪৭২টি টিয়ার শেল ও ৭০টি সাউন্ড গ্রেনেড উদ্ধার হয়েছে।’