আপনার শিল্পী হয়ে ওঠার জার্নিটা যদি একটু বলতেন সংক্ষেপে? আপনি কীভাবে চিত্রকলার প্রতি আকৃষ্ট হলেন এবং একজন চিত্রশিল্পী হয়ে উঠলেন?
শুরু থেকেই যদি বলি আমার পুরো ফ্যামিলিই সংস্কৃতি জগতের মানুষ। আমার আব্বা বলা যায় একজন অ্যামেচার পেইন্টার ছিলেন। তিনি ছবি আঁকতেন, গান গাইতেন। আমার সব ভাইবোনও লেখালেখি ও শিল্পচর্চায় যুক্ত। বলা যায় পারিবারিক পরিবেশ থেকেই শিল্পের নানা দিকের প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়। আমার মায়ের কথাও বিশেষভাবে বলতে হবে। তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন। যেমন ছোটবেলায় মায়ের বালিশের নিচ থেকেই ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ আবিষ্কার করেছিলাম। সারা দিন কাজকর্মের পর বালিশের নিচ থেকে পছন্দের বইগুলো পড়তে বসতেন মা। আমাদের জন্য কিছুটা নিষিদ্ধ ছিল ‘আউটবই’ পড়া। তার পরও লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন বই পড়া শুরু করেছিলাম।
তো এভাবেই শুরু আমার। তারপর এসএসসি পাস করে চারুকলাতে ভর্তি হব বলে মনস্থির করলাম। বাবা চাইতেন আমি যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর’ হই। কিন্তু আমি ছিলাম একরোখা। বললাম, আমার জন্মই তো হয়েছে চিত্রশিল্পী হওয়ার জন্য। আমার দৃঢ় ইচ্ছার কাছে হার মেনে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার অনুমতি দিলেন বাবা। তারপর আশির দশকে চারুকলায় ভর্তি হলাম। ১৯৯১ সালে এমএফএ করলাম চারুকলা থেকেই। তার পর থেকে দেশব্যাপী এক্সিবিশন করে বেড়াচ্ছি। এভাবে শুরু হলো আমার জার্নি।
চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনার মনোজগৎ, কল্পনার জগৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন কোন চিন্তক, পেইন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন?
প্রথমত, আমি এখানে বলব যে আমার বাসার পরিবেশটা শিল্পী হতে সহায়তা করেছে। আমার মায়ের পড়াশোনার অভ্যাস, ভাইবোনদের সাহিত্যচর্চা একটি ইতিবাচক মনোভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। আমার এক বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। তিনি বর্তমানে একজন প্রতিষ্ঠিত কবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সপরিবারে থাকছেন। আমি যখন সেভেন-এইটের ছাত্রী তখন বড় বোনের কাছ থেকে নিয়ে চর্যাপদ পড়েছি। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠতে থাকে। ঘরে আমরা ভাইবোন সবাই গান চর্চা করতাম। ওস্তাদ আব্দুল আজিজ আসতেন, বড় ভাইবোনরা তার কাছে গান শিখতেন, আমিও বসে যেতাম। শুরু থেকেই পরিবারে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি পাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা শুরু করি, সিরিয়াস পড়াশোনা। সবার আগে বাংলা সাহিত্য, তার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য, দর্শন—এ সবকিছুই আমাকে টেনেছে। বাবা-মাকেও আমার মহান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। আমার বাবা সবসময় বলতেন, ও অধম বলে তুমি উত্তম হবা না কেন?" এবং ওই যে ‘আদর্শ লিপি’র সেই যে আদর্শটা বুকে ধারণ করেছি। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘আমার পণ’ থেকে সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলার শিক্ষাগুলো মনে গেঁথে ছিল।
এক কথায় আমার ছেলেবেলাটা খুব অসাধারণ সুন্দর ছিল। আমার এখনকার পেইন্টিংগুলোতে অজস্র হাঁস দেখা যায় এবং তাদের কমলা রঙের ঠোঁট। এই থিমটা বারবার ঘুরেফিরেই আসে। কেন ঘুরেফিরে আসে? তার কারণ হচ্ছে যে আমি আমার সেই ইনোসেন্ট শৈশবে চলে যেতে চাই কালির আঁচড়ে। আমার মার অনেক হাঁস ছিল, তিনি হাঁস পুষতেন। দীননাথ সেন রোডে আমাদের বাড়ির পেছনে অনেক লেক ও পুকুর ছিল। আমি হয়তো দোলনায় বসে আছি, মা কিছু খেতে দিয়েছেন। একই সময়ে হাঁসগুলোকে খাবারের জন্য ডাকতেন। হাঁসের কমলা রঙের ঠোঁট আমার শৈশবের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি হিসেবে গেঁথে রয়েছে যা আমার পেইন্টিংয়ে বারে বারে ফিরে আসে।
২০২৩ সালে আমার একটা এক্সিবিশন হয়েছিল আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে। তিনটা ভাগে ছিল এক্সিবিশনটা, একটা ছিল সোনার বাংলা। কারণ আমি সোনার বাংলার স্বপ্নে বিভোর। আমার মাতৃভূমিকে অনেক ভালোবাসি, সেজন্যে প্রতিনিয়ত সোনার বাংলার স্বপ্ন আঁকি। আমার মনে হয় মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এ স্বপ্নটা দেখেই যাব।
যেমনটা বলছিলেন, আপনি পুরান ঢাকায় বড় হয়েছেন, দীননাথ সেন রোডে। আপনার শৈশবটা ওখানে কেটেছে। আমরা দেখছি যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নগরায়ণের ফলে ঢাকা ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করল, পুরান ঢাকা থেকে বিস্তৃত হয়ে গাজীপুরের দিকে চলে যাচ্ছে। এ ঢাকার রূপান্তরটা আপনি কীভাবে দেখেছেন এবং এটা আপনার শৈল্পিক সত্তায় কীভাবে ভূমিকা পালন করেছে?
আমি আসলে এ পরিবর্তনটাতে খুব একটা পছন্দ করি নাই, সুখী হতে পারি নাই। সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে পরিবেশ বিপর্যয় ও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়েও কাজ করি। আমার একটা ইনস্টলেশনও ছিল একটি এক্সিবিশনে। সেখানে পাটের পাউচের মধ্যে কিছু বীজ ভরে দিয়েছিলাম। সেই প্রদর্শনীর থিম ছিল ‘রিটার্ন টু নেচার’। প্রদর্শনীতে উপস্থিত প্রত্যেক দর্শককে একটা করে পাউচ নিয়ে বলেছিলাম তারা যেন বাসায় গিয়ে গাছগুলো পুঁতে দেন।
আমার বাসার চারপাশে ছিল লেক, পুকুর ও শান বাঁধানো ঘাট। ছিল নানা বৃক্ষ, লতা গুল্ম ও ফুল-ফলের গাছ। ঘাস ও গাছের সঙ্গে আমরা নানা খেলায় মিলতাম। অরণ্যের মধ্যে ছিল আমাদের বসবাস। আমি মনে করি সেসব বৃক্ষ, লতা-গুল্ম ছিল আমাদের ভাই-বোন। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা মূর্খের মতো আমাদের ভাইবোনদের মেরে ফেলছি। নদীকে ভরাট করে, পুকুরকে ভরাট করে আমরা ইচ্ছামতো নির্মাণ করছি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টের পর অ্যাপার্টমেন্ট। এইটা কিন্তু আমাদের অনেক বিপদের দিকেই ঠেলে দেবে।
গত বছর একজন ফরাসি সিনেমা পরিচালক তার দলবল নিয়ে এসেছিলেন আমার বাসায়। তারা পুরান ঢাকার হেরিটেজ বিল্ডিং নিয়ে হয়তো তথ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন। তারা আমার বাসায় এল, খাওয়া-দাওয়া করল। পুরো এলাকা আমি ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিলাম। ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘লায়লা, তোমার তো পুরনো বাড়ি ছিল, তিনতলা বাড়ি। এখন তো সেখান উঁচু ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। এতে তুমি কি খুশি?’ আমি বললাম, ‘না, আমি সুখী হতে পারছি না। কারণ ওই বাড়িটি ঘিরে আমার যে শৈশব ছিল, আশপাশের পরিবেশ ছিল তা তো ধ্বংস হয়ে গেছে।’
একবার ভাবুন তো যদি ভূমিকম্প হয়, আগুন লাগে আমরা কেউ তো বাঁচব না! আশপাশে কোথাও কোনো পুকুর নেই যেখান থেকে আগুন লেগে গেলে পানি আনা যাবে কিংবা ভূমিকম্পের সময় বিপদ কাটাতে কোনো খোলা জায়গায় এসে যে দাঁড়াব সে জায়গাও নেই।
চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনি বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন মহানগরী ঘোরেন, ভ্রমণ করেন। আপনার অনেকগুলো প্রদর্শনী হয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের চিত্রকর্মের বা চিত্রশিল্পীদের কদর কেমনটা বাড়ছে? বা এ বাজারে, এখন তো একটা গ্লোবাল বাজারে আমরা অবস্থান করছি, আমাদের চিত্রকর্মের বাজারটা কেমন বিশ্ব পরিসরে?
আমার মনে হয়, এখনকার ছেলেমেয়েরা বেশ ভালো কাজ করছে। তারা অনেক ব্রিলিয়ান্ট এবং তারা বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের যে মার্কেটিং—এখনো সেভাবে দাঁড়ায়নি। আমাদের চিত্রশিল্প ও সাহিত্য কিন্তু বিশ্ব পরিসরে আরো মনোযোগ দাবি রাখে। বাজারের সঙ্গে একটা সংযোগ হলে তখন আরো বড় শিল্পী-সাহিত্যিক তৈরি হবে। এজন্য যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়েও জোর দিতে হবে।
আমরা যেমনটা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গল্প শুনি, উনি ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে বসে আঁকতেন। ভাবতেন উনি বড় শিল্পী হবেন এবং নিজে অনেক কষ্ট করে কলকাতা আর্ট কলেজে চলে গিয়েছিলেন। এখন কি আমাদের শিশুদের মধ্যে যারা শিল্পী হতে চায়, যারা ভিন্নতর কিছু করতে চায়, তাদের জন্য সে রকম পরিবেশ বাংলাদেশে আছে বলে মনে করেন?
শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ করার জন্য সেরকম পরিবেশ আমরা এখনো দিতে পারিনি। আমরা যদি শিশুদের মনোজগৎ গড়তে চাই, চৈতন্য জাগ্রত করতে চাই তাহলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের মধ্য থেকেই কেউ ভবিষ্যতের সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, বিজ্ঞানী, রাজনীতিক হবে। তাদের মনোজগৎ সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য শিল্প-সাহিত্যের সবগুলো ফর্মের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় গড়ে দিতে হবে।
আমরা যদি আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দেখি, এখন কিন্তু চারু ও কারুকলাকে তেমনটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। অনেক সময় সেখানে ভালো শিক্ষক দেয়া হয় না। এমনকি গত বছর সংগীত ও চিত্রকর্মের শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে বাংলাদেশে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিশুদের মনোজগৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিত্রকলা কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে?
আমি মনে করি, চিত্রশিল্প অনেক বড় একটা স্কুল। একই কথা প্রযোজ্য সংগীত ও সাহিত্যের বেলায়ও। আমি যখন শিশুদের কোনো আর্ট কম্পিটিশনে যাই, তখন আমাকে কিছু বলতে বলা হলে, বক্তৃতা দিতে হলে শুরুতেই বলি—ছোট্ট শিশুরা তোমরা কি জানো, আমরা যে আমাদের আসবাবগুলো প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি তা কেন করি? আমাদের শরীরে যাতে কোনো জীবাণু না আসে, যেন স্বাস্থ্যহানি না হয় সেজন্য করি। একইভাবে আমাদের মনের ভেতর অনেক কালিমা জমে। সেটাকে আমরা পরিষ্কার করব কীভাবে? মনের কালিমা দূর করার জন্যই আমাদেরকে চিত্রকলা, সংগীত ও কবিতার কাছে যেতে হবে।"
আপনার কথায় চিত্রকর্মের সঙ্গে সাহিত্যের সংযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। আপনি টিএস এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর ভিত্তিতে এঁকেছেন। শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে চিত্রকলার সংযোগটা কেমন এবং কীভাবে একটি ফর্ম অন্যটিকে প্রভাবিত করে?
প্রত্যেকটি শিল্পই একে অন্যের সঙ্গে আন্তঃসংযুক্ত। আমরা একটা গ্লোবাল ভিলেজে বসবাস করছি, সে কারণে বিভিন্ন আর্ট ফর্মের মধ্যে আন্তঃসংযোগ অনুসন্ধান আরো জরুরি। আমরা যদি বিশ্বের বিভিন্ন এক্সিবিশনে অংশ নিতে চাই তাহলে গ্লোবাল ট্রেন্ডটা বুঝতে হবে। কবিতা, নাটক ও সিনেমার প্রভাব যেমন রয়েছে চিত্রকলার ওপর তেমনি চিত্রকলায় অন্যান্য আর্ট ফর্মকে প্রভাবিত করে। তার ওপরে রয়েছে দর্শন। সব আর্ট ফর্মের ওপরই দর্শনের প্রভাব পড়ে। বর্তমানে পেইন্টিং একটা হায়ার ফিলোসফি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সেখানে কারো যদি বিস্তর পড়াশোনা না থাকে চিত্রকল্পে—আপনি নতুন কোনো ফিলোসফি দিতে পারবেন না। আর্টের ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক মুভমেন্ট দেখি, বাংলাদেশেও তার ঢেউ লেগেছে। শিল্পীদের সবসময় সাম্প্রতিক চিন্তার ট্রেন্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়।