এইচঅ্যান্ডএমসহ বড় ক্রেতাদের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে কি

বিশ্বখ্যাত সুইডিশ ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে তাদের ‘নাইন-মান্থ রিপোর্ট ২০২৫’। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের ১৩৫টি বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত সুইডিশ ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে তাদের ‘নাইন-মান্থ রিপোর্ট ২০২৫’। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের ১৩৫টি বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে এশিয়া, ওশেনিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলেই বেশি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, মোট ৭৮টি। এছাড়া নরডিক অঞ্চলে ১৪টি, পশ্চিম ইউরোপে ২১টি, পূর্ব ইউরোপে তিনটি, দক্ষিণ ইউরোপে ১৪টি ও আমেরিকায় বন্ধ হয়েছে পাঁচটি স্টোর।

এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে ৪ হাজার ১১৮টি। এক বছর আগেও ছিল ৪ হাজার ২৯৮টি স্টোর। সব মিলিয়ে দুই শতাধিক বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবার নতুন করে ৮০টি বিক্রয় কেন্দ্র চালুরও ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ৩৯ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। আর এসব পণ্যের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম। অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশের রফতানীকৃত মোট পোশাকের ২-৭ শতাংশ ক্রয় করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডটি। কেবল এইচঅ্যান্ডএম নয়, বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম স্প্যানিশ জায়ান্ট ইন্ডিটেক্স। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট ৫ হাজার ৫৬৩ বিক্রয় কেন্দ্র থাকার তথ্য জানানো হয়। অথচ এক বছর আগেও সংখ্যাটি ছিল ৫ হাজার ৬৯২। ইন্ডিটেক্সের ব্র্যান্ড জারার বিক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যাও কমেছে। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের একই সময়ে অর্থাৎ এক বছরে বিখ্যাত এ ব্র্যান্ডের স্টোর সংখ্যা ১ হাজার ৮১১ থেকে নেমে ১ হাজার ৭৫৯টিতে দাঁড়ায়।

ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের কারণ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষমতা বা কার্যকারিতা বাড়ানো এবং খরচ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আরো দক্ষ বা অপ্টিমাইজ করার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। এইচঅ্যান্ডএম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘‍আমরা আমাদের বিক্রয় কেন্দ্র নেটওয়ার্ককে ক্রমাগতভাবে অপ্টিমাইজ করছি। যেগুলো পর্যাপ্ত লাভজনক নয়, সেগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। যদিও এতে স্বল্পমেয়াদে বিক্রয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে ধাপে ধাপে নতুন ও অধিক লাভজনক বিক্রয় কেন্দ্র খোলা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে।’

বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চেয়ে গতকাল এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশের কার্যালয়ের প্রধান বরাবর ই-মেইল পাঠানো হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার জবাব পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কমকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের প্রভাব এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের মোট ক্রয়েও পড়তে পারে। ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে মোট ক্রয়, যার প্রভাবে বাংলাদেশের ওপরও পড়বে।’ তবে অর্থমূল্যে কী পরিমাণ ক্রয় কমবে তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব না বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

এইচঅ্যান্ডএমের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের তথ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশী পোশাক সরবরাহকারী রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। তাদের দাবি, বাংলাদেশের অন্তত আড়াইশ পোশাক কারখানা নিয়মিতভাবে এইচঅ্যান্ডএমের জন্য পোশাক সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া তাদের পণ্য সরবরাহ-সংশ্লিষ্ট শৃঙ্খলে রয়েছে অন্তত এক হাজার কারখানা। বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়তে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এইচঅ্যান্ডএমের জন্য পোশাক সরবরাহকারী বৃহৎ এক পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি আমাদের দেশের পোশাক খাতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের স্টোর বন্ধ হলে আমাদের দেশে প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশে তাদের মতো অর্গানাইজড সফল ব্র্যান্ড কম। ফলে বৈশ্বিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানের ১৩৫টি স্টোর বন্ধের প্রভাব কোনো না কোনোভাবে আমাদের ওপরও পড়বে। তবে আশা করছি ব্যয় সংকোচন করলেও তাদের ব্যবসা বাংলাদেশে যেভাবে প্রবৃদ্ধির ধারায় ছিল, সে ধারায়ই থাকবে এবং টেকসই হবে।’

পোশাক পণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারকরা বলছেন, এইচঅ্যান্ডএম কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। তবে মোটের ওপর ভালোই চলছিল। প্রতিষ্ঠানটির কাজের গতি কিছুটা ধীর হলেও ১৩৫টি বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ হওয়া স্পষ্টভাবে বড় ইস্যু।

এইচঅ্যান্ডএমের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে কিনা—জানতে চাইলে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হ্যাঁ পড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা স্ট্রাগলিং ছিল, এটা আমি জানি, কিন্তু অত খারাপ না, ভালোই চলছিল। কিছুদিন আগেও প্রতিষ্ঠানটির একটি সম্মেলনে ঘুরে এসেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে তুলনামূলকভাবে তারা কিছু স্লো কিন্তু স্টোর বন্ধের ১৩৫ সংখ্যাটি অনেক বড়। নয় মাসে হলেও সংখ্যাটি অনেক। এত স্টোর বন্ধ হয়ে থাকলে সেটা একটা মেজর ইস্যু। এইচঅ্যান্ডএমের কাজ আমিও করি। সেখানে ক্রয় কমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখতে পাইনি।’

আরও