চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর এলাকার খামারি সাদ্দাম হোসেনের খামারে তিন হাজার মুরগি ছিল। গত কয়েক দিনে ৬০০ মুরগি মারা গেছে। তার মুরগির ওজন ছিল গড়ে দেড় কেজি। তীব্র গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে এসব মুরগি।
ফেনীর সদর উপজেলার মেসার্স মাস্টার পোলট্রি ফার্মে প্রায় ৩০ হাজার মুরগি রয়েছে। হিটস্ট্রোকে মারা গেছে তিন শতাধিক মুরগি। খামারটির মালিক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুইদিনে অতিরিক্ত গরমে মুরগি হাঁসফাঁস শুরু করেছে। ৩০০ মুরগি মারা গেছে। তাপ কমাতে বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে ঝরনা মতো করে টিনের ওপর পানি ছিটাচ্ছি। লোডশেডিং থাকলে জেনারেটর দিয়ে পানি ছিটাই। তার পরও মুরগি বাঁচানো যাচ্ছে না।’
চলতি মৌসুমে তাপপ্রবাহ মাঝারি থেকে অতি তীব্র হচ্ছে। গত কয়েকদিনে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে তাপমাত্রার পারদ চড়ছে। গতকাল সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায়। এছাড়া রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, টাঙ্গাইলে তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি। অতি তীব্র তাপমাত্রার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে ব্রয়লার, সোনালি ও লেয়ার মুরগির খামারে। যথাযথ প্রস্তুতি না থাকা এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকটা অসহায় প্রান্তিক খামারিরা। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শত শত মুরগি। বিশেষ করে ঝুঁকিতে রয়েছে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি। হিটস্ট্রোকে এ পর্যন্ত এক লাখ মুরগি মারা গেছে দাবি বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদারের। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত এক লাখ মুরগি মারা গেছে। তীব্র দাবদাহের কারণে অসহনীয় হয়ে উঠেছেন খামারিরা। নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন খামারি। অনেক খামার বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।’
অতি তীব্র তাপমাত্রা ও লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগি মারা যাচ্ছে বলে মনে করছেন খামারসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, মৌসুম অনুযায়ী এ সময়ে তাপমাত্রা বেশি থাকে। প্রতি বছর ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত থাকে। এবারো এ রকমই দেখা যাচ্ছে। এ তাপমাত্রায় খামারে মুরগি পালন কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্রয়লার মুরগির জন্য ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা সহনশীল, সেখানে তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৪০ ডিগ্রি। তাই সহ্য করতে না পেরে মারা যাচ্ছে। এছাড়া খামারে মুরগিকে যে খাবার দেয়া হয় তা অনেক ভারী খাবার। যার কারণে মুরগির শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১ থেকে ২ ডিগ্রি বেশি থাকে। একদিকে তাপমাত্রা বেশি, অন্যদিকে শারীরিক তাপমাত্রা। যার কারণে হিটস্ট্রোক করছে। এছাড়া খামারে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবেও মুরগি মারা যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা ফার্মাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আজিজুল হক বলেন, ‘গত তিনদিনে চুয়াডাঙ্গায় ৫০ হাজার মুরগি মারা গেছে, যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। প্রতিদিন শত শত মুরগি মারা যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে, ডিম ও মাংসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ডিম উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এর ফলে প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থায় খামারিরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
টাঙ্গাইল সদরের খুদিরামপুর গ্রামের খামারি আহমেদুর রহমান নিপুণ বলেন, ‘সোনালি মুরগি কিছুটা গরম সহ্য করতে পারে। তবে লেয়ার ও ব্রয়লারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ডিম উৎপাদন ও মুরগির ওজন বৃদ্ধিতে। গরম বেশি হওয়ায় খাবার কম দিতে হচ্ছে, আবার অনেক মুরগির শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে।’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রিটন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তীব্র দাবদাহের কারণে ১০-২০ শতাংশ পোলট্রি মুরগি মারা গেছে। ডিমের উৎপাদন কমে গেছে ২০ শতাংশের বেশি। খামারিদের বিকল্প উপায়ে বাতাস, পানির ছিটা কিংবা স্যালাইন পানি দিয়ে মুরগিগুলোকে সুস্থ রাখার পরামর্শ দিচ্ছি।’
চাঁদপুর মতলব উপজেলার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের কর্মকর্তা পলাশ কুমার দাস বলেন, ‘তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে খামারিরা মুরগির খাঁচায় পর্যাপ্ত বাতাস সরবরাহ করতে পারছেন না, যার কারণে মুরগি হিটস্ট্রোক করছে। এখন কোনো চিকিৎসা দিয়েও মুরগি বাঁচানো সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এতে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।’
নরসিংদীর মুরগি খামারি জেসমিন বেগম বলেন, ‘এবার এমনি মন্দ যাচ্ছে। তার মধ্যে এক হাজার ব্রয়লার মুরগির ৭০টি মারা গেছে। আরো কিছু অসুস্থ হয়ে পড়ছে।’
দাবদাহ থেকে মুরগিকে রক্ষা করতে স্থানীয় পর্যায়ে নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সম্প্রসারণ) ডা. বেগম শামছুননাহার আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক খামারিদের জন্য কিছু নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। সেগুলা পালন করলে মুরগি রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
তীব্র গরম থেকে মুরগি বাঁচাতে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. বাপন দে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হিটওয়েভের কারণে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। খামারিরা এখানে কিছু উদ্যোগ নিতে পারেন। যেহেতু দুপুরে গরমটা বেশি থাকে তাই বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত খাবার বন্ধ রাখা। এ সময়ে কম খেলেও মুরগির ওজনের ঘাটতি হবে না, বরং মৃত্যুর প্রবণতাটা কমে যায়। লেবুর রসে ভিটামিন থাকে তাই সেটি চার-পাঁচ লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। পানিতে বরফ টুকরা দেয়া, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বাড়ানো, কৃত্রিম ফ্যানের ব্যবস্থা করা, খামারের চালে ভেজা বস্তা দেয়া এবং খামারকে বিস্তৃত করে বড় জায়গায় মুরগি ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। এগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান। এতে মুরগির মৃত্যুর প্রবণতা অনেকটা কমে যাবে।
দেশে মুরগির মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণে প্রধানত ভূমিকা রাখেন প্রান্তিক খামারিরা। হিটস্ট্রোকে এভাবে মুরগি মারা যেতে থাকলে মাংস ও ডিম উৎপাদন কমার পাশাপাশি বাজারে ঘাটতি দেখা দেবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এক লাখ মুরগি মারা গেছে, যাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দেশের মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণ করেন প্রান্তিক খামারিরা। কিন্তু ডিমের বাজারের সিন্ডিকেট ও করপোরেট ব্যবসায়ীদের কারণে ন্যায্যমূল্য পান না খামারিরা। এখন কেজিপ্রতি ৩০ টাকা ক্ষতিতে মুরগি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। অনেকে মুরগি বিক্রি করে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। এখানে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সরকার প্রান্তিক খামারিদের ব্যবসায় টিকিয়ে রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।’
মুরগির উৎপাদন কমলে বাজারে মাংস ও ডিমের দাম বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বগুড়ার মুরগি ব্যবসায়ী বাদল জানান, ‘খামারিদের কাছ থেকে বিক্রির জন্য কিনে নিয়ে আনার পর গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মুরগি। বিশুদ্ধ পানি দেয়া হচ্ছে। খাবার কম দেয়া হচ্ছে তবু অনেক মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এ কারণে কম দামেও বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. বেগম শামছুননাহার আহম্মদ বলছেন, ‘উৎপাদন কম হলে মাংস ও ডিমের দাম কিছুটা বাড়বে।’
হিটস্ট্রোকে মুরগি মারা যাওয়া কমতে শুরু করেছে ডিম উৎপাদন। আবার একদিনের বেশি ডিম মজুদ রাখতে পারছেন না আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। চাঁদপুরের ডিম বিক্রেতা সোহেল জানান, আগের তুলনায় ডিম বাজারে কম আসছে। হিটস্ট্রোকের ভয়ে মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন খামারিরা। এভাবে চলতে থাকলে ডিমের দামও বেড়ে যাবে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পাইকারি ডিম বিক্রেতা কামাল হোসেন বলেন, ‘তীব্র গরমে ডিম উৎপাদন কমেছে। এক সপ্তাহ আগের ১০০ ডিমের দাম ৮৫০ টাকা ছিল। এখন সেটি ৯৫০ টাকায় বিক্রি করছি। ডিম উৎপাদন কম হওয়ায় বেচাও কম।’
ডিমের উৎপাদন কমলে দাম বাড়তে পারে জানান রাজধানীর তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ। তিনি বলেন, ‘খামারে মুরগি মারা যাওয়ার কারণে ডিম আগের চেয়ে কম আসছে, সরবরাহ কমে যাচ্ছে। আবার ডিম মজুদ করা যাচ্ছে না। একদিনেই ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডিম সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে দাম কিছুটা বেড়ে যাবে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম, গাজীপুর, চাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা, ফেনী, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী প্রতিনিধি