বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলীর বড় ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম পড়াশোনা করেছেন ভারতের শিলিগুড়ির একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। ছেলের পড়াশোনার সূত্র ধরে বাবা নিয়মিত যাতায়াত করতেন প্রতিবেশী দেশটিতে। সেই সময় তিনি দেশ থেকে অবৈধ পথে অর্থ পাচার করে শিলিগুড়িতে একটি বাড়ি কেনেন। পাশাপাশি সেখানে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করেন। এছাড়া দেশে আবেদ আলীর নামে বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে। এ চক্রে জড়িতদের ৭০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা শুরুর পর প্রথম ধাপে জব্দ করা হয় আবেদ আলী ও তার মালিকানাধীন ইউএসএ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্সের ব্যাংক হিসাব। পরে বিভিন্ন উৎস থেকে আবেদ আলী ও তার সহযোগীদের ৭০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ব্যাংক হিসাবের অধিকাংশ ঢাকার। কয়েকটি হিসাব রয়েছে মাদারীপুরে। ব্যাংক হিসাবগুলোয় আবেদ আলী ও তার পরিবারের সদস্যদেরও আর্থিক লেনদেনের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে আরো ব্যাংক হিসাব এবং লেনদেন চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া আবেদ আলী চক্রের ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, বনশ্রীতে বাড়ি ও প্লটের সন্ধান মিলেছে। পাশাপাশি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে রয়েছে আবেদ আলীর খামার ও বাগানবাড়ি। এছাড়া তার বড় ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম শিলিগুড়িতে পড়াশোনার সময় সেখানে একটি বাড়িও কিনেছেন আবেদ আলী। এসব সম্পদের আয়ের উৎস সম্পর্কে এখনো আবেদ আলী নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি।
পিএসসির তিনটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর সোমবার আবেদ আলী ও তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের মধ্যে ছয়জন গতকাল নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে আবেদ আলীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আবেদ আলী পিএসসিতে চালক হিসেবে চাকরি পাওয়ার পরই কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। এভাবে চক্র তৈরি করে ৩৩ থেকে ৪৫তম বিসিএসের প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন। এছাড়া তারা নন-ক্যাডার পদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস করেন। ঠিক ওই সময়ই আবেদ আলীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাড়তে শুরু করে। পাশাপাশি ব্যাংক হিসেবেও জমা হতে থাকে নগদ অর্থ। অবৈধভাবে উপার্জন করা এসব টাকায় তিনি ঢাকার মিরপুর ও উত্তরায় করেছেন দুটি বহুতল বাড়ি। এর মধ্যে একটি বাড়ি ছয়তলা। এছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় সাতটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। রয়েছে তিনটি প্লট। নিজে ও পরিবারের সদস্যরা চলাফেরা করেন দামি গাড়িতে। গ্রামের বাড়িতেও বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন আবেদ আলী। নিজের নামে তৈরি করেছেন মসজিদ। রয়েছে ডেইরি ফার্ম ও বাগানবাড়ি। রাস্তার পাশে সরকারি জায়গা দখল করে তৈরি করেছেন মার্কেট। অবৈধ টাকা দিয়ে গ্রুপ অব কোম্পানি খুলেছেন। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স কোম্পানিও রয়েছে তার মালিকানায়।
বিপিএসসির বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ১৭ জনসহ ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে সরকারি কর্ম কমিশন আইনে মামলা করে সিআইডি। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো অন্তত ৫০-৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংঘবদ্ধ এ চক্রের হোতা সাজেদুল। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফরের কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন। পরে তিনি অন্যান্য সহযোগী সাখাওয়াত ও সাইমের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া বা হোটেলে জড়ো করতেন। পরীক্ষা শুরুর ১-২ ঘণ্টা আগে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ও উত্তর ফাঁস করতেন। সাজেদুল তার সহযোগীদের মাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সৈয়দ আবেদ আলীর কাছে বিপিএসসির অধীনে রেলওয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের (নন-ক্যাডার) নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর বিতরণ করেছেন।
সিআইডির মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিএসসির সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলীসহ তার সহযোগীদের ৭০টি ব্যাংক হিসেবের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অবৈধ টাকায় কেনা আবেদ আলীর দুটি বাড়িসহ বেশকিছু প্লট ও ফ্ল্যাটের তথ্য হাতে এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষাসহ গত ১২ বছরে ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। ওইদিন আদালতে তদন্তে পাওয়া বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।’
এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন বিপিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলী এবং তার ছেলে ছাত্রলীগ নেতা সোহানুর রহমান সিয়াম, বিপিএসসির উপপরিচালক মো. আবু জাফর ও মো. জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবির, অফিস সহায়ক খলিলুর রহমান ও অফিস সহায়ক (ডেসপাস) সাজেদুল ইসলাম। এছাড়া সাবেক সেনা সদস্য নোমান সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু সোলায়মান মো. সোহেল, অডিটর প্রিয়নাথ রায়, ব্যবসায়ী মো. জাহিদুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তাপ্রহরী শাহাদাত হোসেন, ঢাকার ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত মো. মামুনুর রশীদ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান মো. নিয়ামুন হাসান, ব্যবসায়ী সহোদর সাখাওয়াত হোসেন ও সায়েম হোসেন এবং লিটন সরকার।