চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলাটিতে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে নয়টিই গলা কেটে হত্যা। বাকিগুলো পিটিয়ে, গুলিতে। মাদক, ছিনতাই, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডে চাকু, ছুরি ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
গত ২৪ জুন যশোর সদরের রঘুরামপুর গ্রামে বাড়ির পাশের ঝোপ থেকে সাইদ সরদার ওরফে চশমা সাইদ (৩২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১২টি মাদক মামলার এ আসামিকে দুর্বৃত্তরা প্রথমে পা বেঁধে, পরে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। মাদক ব্যবসা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা পুলিশের। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ দুজনকে আটক করে।
এর আগে ২১ জুন চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের খালে ভাসমান অবস্থায় আতিয়ার রহমান (৪২) নামে এক বিএনপি কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তে জানা যায়, এটিও গলা কাটা ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ক্ষতবিক্ষত। লিজ ও বাঁওড়কেন্দ্রিক পূর্ববিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পরিবারের দাবি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৮ জুন সদর উপজেলার শেখহাটি তামালতলা এলাকায় ভালোবেসে বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নববধূ সামিনা আক্তার শাম্মীকে (২০) গলা কেটে হত্যা করে তার বেকার স্বামী সুজন। পুলিশ জানায়, মাদক সেবনের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে স্ত্রীকে হত্যার পর সুজন নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। একই দিন রাতে মণিরামপুর উপজেলার শরমপুর গ্রামে নাতনিকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ইমামুল হোসেন (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করে বখাটেরা। গত ২২ এপ্রিল শহরের বেজপাড়া এলাকায় সামান্য বকাঝকা করার জেরে শাশুড়ি সকিনা বেগমকে (৬০) চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন ২০ বছর বয়সী পুত্রবধূ মরিয়ম বেগম। শুধু তা-ই নয়, হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গুলি-বোমার বদলে যশোরে হত্যায় ছুরি-চাকুর ব্যবহার বেড়েছে। কাউকে গুলি করে বা বিস্ফোরক দিয়ে মারলে হত্যা মামলার পাশাপাশি অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা মোকাবেলা করতে হয়। বাড়তি মামলার ঝক্কি এড়াতে ছুরি-চাকুর ব্যবহার হচ্ছে বেশ আগে থেকে। তবে তিন বছরে অপরাধমূলক ঘটনায় ছুরি-চাকুর ব্যবহার বেড়েছে। সম্প্রতি সংঘটিত হওয়া হত্যাকাণ্ডের নথি এটিই প্রমাণ করে।
এছাড়া জেলা শহরে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক-প্রেমিকা বা কাপলদের টার্গেট করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া অহরহ চুরির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নিচতলার বাড়ির এসির পাইপ খুলে নিয়ে যাচ্ছে চোরেরা। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ চিহ্নিত করা হয়েছে ও জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অপরাধীরা একেক সময় একেক ট্রেন্ডিংয়ে থাকে। ভারী অস্ত্রের চেয়ে ছুরি-চাকু কেনা এখন সহজলভ্য হয়ে গেছে। যে কেউ অনলাইনে কিনতে পারছেন। এ বিষয়ে সরকারকে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কে অনলাইনে এসব পণ্য বিক্রি করতে পারবে আর কে কিনতে পারবে।’
যশোরে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রয়েছে দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ নিয়মিত টহল ও যশোরবাসীকে শান্তিতে রাখতে কাজ করছে।’
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের জেলা সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, ‘মানুষের জানমাল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের বিকল্প নেই। কিন্তু নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে—এমন পুলিশ প্রশাসন নাগরিকরা পায়নি। এমনকি ফ্যাসিস্টের পতনের পরও পুলিশের সে ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না।’