শেবাচিম হাসপাতালের বেশির ভাগ চিকিৎসা সরঞ্জামই অচল

প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালমুখী

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হাবিব সরদার। সম্প্রতি স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্ত্রী তাসলিমা বেগম।

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হাবিব সরদার। সম্প্রতি স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্ত্রী তাসলিমা বেগম। রোগীর দ্রুত এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) করাতে বলেন চিকিৎসক। রেডিওলজি বিভাগে গিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের এমআরআই মেশিন। ওই কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ একজন ছুটে এসে জানান, পরীক্ষাটি বাইরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে খুব দ্রুতই করানো যাবে। তার মাধ্যমে গেলে খরচও কম পড়বে। কোনো উপায় না পেয়ে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালের পেছনে বাংলাবাজার এলাকার ওই রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে ছুটে যান তাসলিমা বেগম।

কেবল তাসলিমা বেগমই নন, শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় প্রায় সব রোগী ও তাদের স্বজনদের। বরিশালসহ আশপাশের জেলার মানুষের চিকিৎসাসেবা নেয়ার একমাত্র পূর্ণাঙ্গ এ প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আর যেগুলো দিয়ে কোনো রকমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে সেগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ। তাই এর সুযোগ নিচ্ছেন হাসপাতালের আশাপাশে গড়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা। বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বেসরকারি এসব রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এছাড়া সরকারি হাসপাতালটিতে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ ও সিট বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ সন্দ্বীপ-হাতিয়া, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জের একাংশের জনসাধারণ চিকিৎসাসেবা নিতে আসছে বরিশালের এ হাসপাতালে। হাজার শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকে গড়ে ১ হাজার ৭০০ রোগী। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয় হাজারের বেশি। তবে সিন্ডিকেট-বাণিজ্যের কারণে রোগীরা পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মচারীসহ নগরীর অনেক প্রভাবশালী ঠিকাদার এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত।

শেবাচিম হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র শয্যা আছে ৩০টি। কিন্তু নেই ডায়ালাইসিস সুবিধা। হৃদরোগীদের চিকিৎসায় এনজিওগ্রামের ব্যবস্থা থাকলেও নেই কোনো চিকিৎসক। কোটি টাকা মূল্যের রোগ নির্ণয় সরঞ্জামগুলো পড়ে আছে বিকল হয়ে। আইসিইউ সুবিধার অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও ব্যবহার হয় না। হাসপাতালের বাকি চারটি অ্যাম্বুলেন্সসেবাও পায় না সাধারণ রোগীরা। হাসপাতালের বাইরে গড়ে উঠেছে এর বিশাল বাণিজ্য, যেখানে রয়েছে শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স। এগুলো দিয়ে শেবাচিম থেকে ১৫৫ কিলোমিটার দূরের রাজধানীতে রোগী বহনে গুনতে হয় ১০ হাজার টাকা, যা নির্ধারণ করে দিয়েছে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি।

শেবাচিমের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি পরিত্যক্ত হয়েছে অনেক বছর আগে। হাসপাতালের পাঁচটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের তিনটি অচল দুই-তিন বছর ধরে। ১৩টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে বিকল আটটি। আবার বিকলগুলোর মধ্যে পাঁচটি এক্স-রে মেশিন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একমাত্র এমআরআই মেশিনটি বিকল দীর্ঘ আট বছর ধরে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে ইকোকার্ডিওগ্রাম মেশিন অচল থাকায় সেবা পাচ্ছে না হৃদরোগীরা।

হাসপাতালের ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয় ২০১৪ সালে। এটি বন্ধ থাকায় মাঝে টানা তিন বছর এনজিওগ্রাম বন্ধ ছিল। ক্যাথল্যাব পরিচালনাকারী টেকনিশিয়ান গোলাম মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ এ মেশিন বারবার সার্ভিসিং করে সচল রাখতে হচ্ছে। যেকোনো সময়ে আবার অচল হয়ে যেতে পারে। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি স্থায়ীভাবে অচল।’

বরিশাল নগরীর স্ব রোড এলাকার আনিছুর রহমান চোখের সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি চিকিৎসা নিতে আসেন শেবাচিম হাসপাতালে। তার চোখের চিকিৎসার জন্য দরকার ল্যাসিক মেশিন। তবে চিকিৎসক জানান, হাসপাতালের মেশিনটি সাত বছর ধরে অকেজো হয়ে আছে। এখন প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে তাকে চিকিৎসা নিতে হবে। বাধ্য হয়ে আনিছুর রহমান নগরীর ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। চোখের ছানি অপারেশনের ফ্যাকো মেশিনটিও সাত মাসের বেশি সময় ধরে অকেজো। তাই চোখের চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে শেবাচিমের চিকিৎসকদের।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল নগরীর সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের দামি যন্ত্রপাতিগুলো কেন অচল থাকবে? আসলে কর্মচারীরাই এগুলো অচল করে রোগীদের বাইরে পাঠায়। তাই যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ করা, ওয়ার্ডগুলোয় সেবা নিশ্চিত করা, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।’

শেবাচিম হাসপাতালের সামনে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সেখানে রোগী পাঠালে চিকিৎসকরা ৪০ শতাংশ হারে কমিশন পান বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর রোগী নেয়া দালালরা পান ১০ শতাংশ। হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন হাসপাতালের কর্মচারী শহীদ, কালাম মৃধা, মিলন ও ধলা জাফর। আর পাঁচ ভাই রবিন, কবির, আজিজুল, হাসিব ও মিলন এবং তাদের এক ভগ্নিপতি হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রোগী ভাগিয়ে নেন। প্রতি হাজারে তারা কমিশন পান ৩০০ টাকা।

হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তালিকায় থাকলেও অনেক খাবার সরবরাহ করা হয় না। তার পরও নিয়মিত বিল ও যুগের পর যুগ একই ঠিকাদারের ওপরই ভরসা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেবাচিম হাসপাতালে তিনবেলা খাবারসহ সব ধরনের কাজের ঠিকাদার চারজন—হাসিব মল্লিক, মরণ পিপলাই, আশরাফুল ইসলাম রেজা ও ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মজিবর রহমান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তারাই ঠিকাদারি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওষুধ সরবরাহের ঠিকাদারি করেন সাবেক কাউন্সিলর মজিবর রহমানের ভাই শাহীন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

শেবাচিম হাসপাতালে চলতি বছর চিকিৎসা নিয়েছেন বরিশাল নগর উন্নয়ন ফোরামের সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু। তিনি জানান, তিনি গত বছর ২৭ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত শেবাচিমে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনা অবর্ণনীয়। হাসপাতালের সিন্ডিকেট ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর ওপর নির্ভর করবে হাসপাতালে ভবিষ্যৎ সেবার মান।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিচালকসহ অনেক চিকিৎসক ও ইন্টার্নিকে হাসপাতাল ছাড়তে হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন পরিচালক। হাসপাতাল সূত্র বলছে, চিকিৎসকের সংখ্যা আগেও কম ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা চলে যাওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিচালক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মশিউল মুনীরকে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।

হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উপপরিচালক এসএম মনিরুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘আমরা বিগত দিনের অনিয়ম ভেঙে দিতে চেষ্টা চালিয়ে আসছি। নতুন পরিচালক যোগদানের পর অচল ও বাতিল হওয়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল ও নতুন স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি। আশা করি শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে। আর সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে আমরা নতুন পরিচালকের নেতৃত্বে কাজ করে আসছি। এরই মধ্যে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও খাবারের মানোন্নয়ন করা হয়েছে। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে হয়ে যাবে বলে আশা রাখছি।’

আরও