এভিয়েশন হাব গড়তে নতুন বিমানবন্দরের বিকল্প নেই

টিএএস গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একজন উদ্যোক্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এ খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দেশের এভিয়েশন খাতের বর্তমান অবস্থা, বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, নীতিগত সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার ‘অন্তর্দৃষ্টি’তে

বিশ্ব অর্থনীতি এখন নানা চাপের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণের পথে রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি কোথায় এবং প্রধান দুর্বলতাগুলো কী?

পৃথিবীতে যখনই মন্দা বা অর্থনৈতিক সংকট আসে, তখন সময় বাঁচানো ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তা মোকাবেলা করা যায়। এক্ষেত্রে এভিয়েশন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাশ্রয়ী ভ্রমণ, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বেশি ফ্লাইট থাকলে ব্যবসায়ীরা কম সময়ে এবং কম খরচে যাতায়াত করতে পারেন। যেমন চীন থেকে স্পেয়ার পার্টস আমদানিকারক একজন ব্যবসায়ী প্রয়োজন হলে দ্রুত গিয়ে দরদাম ও অন্যান্য কাজ সেরে ফিরে আসতে পারেন। এতে ব্যবসায় মূল্য সংযোজন হয়। তাই সংকটের সময়েও মানুষের সময় বাঁচানো, যাতায়াতের দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পৌঁছে দিতে এভিয়েশন শিল্পের বড় ভূমিকা রয়েছে।

এভিয়েশন শিল্পও মন্দার মুখে পড়ে। কভিডের সময় এ খাত সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে এটি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মাঝারি ও ছোট এয়ারলাইনসগুলোর ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের দায় তৈরি হয়। কারণ বিমান না চললেও নির্দিষ্ট সময় পর পার্টস পরিবর্তন, ওভারহোল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিমান অলস পড়ে থাকলেও বড় ধরনের ক্ষতি ও অবচয় হয়। তারপরও মানুষ যখন দুই বছর চলাফেরা করতে পারেনি, তারা কিন্তু আবার ফিরে এসেছে। মানুষের চাহিদা এবং অর্থনীতি যেখানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেখানে এভিয়েশন শিল্প যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো আমাদের এয়ারলাইনস থাকলেও পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সহায়ক উপাদান এখনো তৈরি হয়নি।

সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো শক্তিশালী দেশীয় ক্যারিয়ারের অভাব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো প্রতি বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স সারপ্লাস হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমাদের অংশগ্রহণ খুবই কম। বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে প্রায় ৫০০ ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ থাকলেও সক্ষমতার অভাবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দুবাই থেকে সপ্তাহে ১৪২টি ফ্লাইট এলেও বাংলাদেশ থেকে এর এক-তৃতীয়াংশও যায় না। এ বাজার ধরতে ১৫০-২০০টি বিমান প্রয়োজন। পাশাপাশি বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও সহায়ক এভিয়েশন শিল্পও উন্নত করতে হবে।

বাংলাদেশকে কার্যকর এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু? এক্ষেত্রে প্রধান বাধা কী?

এটি করা সম্ভব। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দিল্লি বা করাচির মতো পুরোপুরি না হলেও আমরা অন্তত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। তবে তার জন্য আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হবে। তৃতীয় টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর আমরা একটি মাঝারি মানের হাব গড়ে তোলার কথা চিন্তা করতে পারি। কলকাতা বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ ১৮টি, অন্যদিকে আমাদের নতুন টার্মিনালসহ প্রায় ২৯টির মতো হবে। কলকাতায় সব মিলিয়ে পার্কিং সুবিধা আছে ৭১টির মতো, আর আমাদেরও আউটবেসহ প্রায় ৬৪টির কাছাকাছি পার্কিং সুবিধা থাকবে। তবে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রানওয়ে। এখানে সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের হয়তো ৫০ বা ৭০টি বিমান পার্কিং করার সুবিধা আছে, কিন্তু রানওয়ের সক্ষমতার ওপর মূল বিষয়টি নির্ভর করে। কলকাতায় প্রতি ২ মিনিটে একটি বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ করে এবং তারা প্রতিদিন এক হাজার বিমান পরিচালনা করে। আমাদের এখানে এ সংখ্যা ৩০০। আমাদের একটা রানওয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারলে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ শতাধিক বিমান পরিচালনা করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার উন্নয়ন এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল চালু হলে এভিয়েশন খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

এভিয়েশন শিল্পে আমরা সবচেয়ে বড় সুবিধা নিতে পারি, কারণ আমাদের ১২ মিলিয়ন মানুষ বিদেশে থাকেন। এছাড়া আমরা যদি ট্রানজিট হাব গড়ে তুলতে পারি, তবে আরো সুবিধা হবে। বর্তমানে আমরা অভ্যন্তরীণসহ বছরে ছয়-সাত মিলিয়ন যাত্রী পরিচালনা করি, কিন্তু এ টার্মিনালের সক্ষমতা ২০ মিলিয়ন। আগামী পাঁচ বছরে যদি আমরা ২০ মিলিয়ন যাত্রী নিশ্চিত করতে চাই, তবে বিমানবন্দরে অনুকূল পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন দুবাই থেকে যে বিমানগুলো আসছে, সেখান থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ যাত্রী আসিয়ান দেশগুলোতে যান। আমাদের যদি সক্ষমতা থাকে এবং আমরা যদি সেখানে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করি এবং ৩০ শতাংশ আসন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রাখি, তবে তাদের এখানে এনে বড় বিমানে করে গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব। এভাবেই মূলত হাবের কার্যক্রম শুরু করা যায়। বিমানবন্দরের মধ্যে ট্রানজিট যাত্রীরা যে ২-৪ ঘণ্টা থাকবেন, তাদের জন্য একটি উপযুক্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বিমানবন্দরেও যদি আমরা সুন্দর ইকোসিস্টেম ও কানেক্টিভিটি তৈরি করতে পারি, তবে আমরাও সফল হব। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে শুধু একমুখী বা পয়েন্ট টু পয়েন্ট যোগাযোগ হচ্ছে। বিমানবন্দরে নামলে দেখবেন ২০টির মতো হোটেলের কাউন্টার এবং প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা লাউঞ্জ আছে, যা বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে সেন্ট্রাল হোটেল ডেস্ক এবং সমন্বিত লাউঞ্জ থাকে, যেখানে সব কার্ড ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হয়। আমাদেরও আন্তর্জাতিক মানের বড় লাউঞ্জ ও কেনাকাটার জন্য আউটলেট রাখতে হবে, যেখানে কফি, স্ন্যাকসসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা থাকবে। লং ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দর সংলগ্ন সিভিল এভিয়েশনের খালি জায়গায় আমরা একটি ‘অ্যারোসিটি’ গড়ে তুলতে পারি। যেখানে যাত্রীরা সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক কিনতে পারবেন, সস্তায় থাকতে পারবেন এবং খাওয়া-দাওয়া ও কেনাকাটা সেরে নির্ধারিত সময়ে চলে যেতে পারবেন।

এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার জন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো, স্লট ব্যবস্থাপনা এবং বিমানবন্দর পরিচালনায় এসব জায়গাতে সংস্কার প্রয়োজন আছে?

অবশ্যই। আমাদের যেহেতু একমুখী রানওয়ের সীমাবদ্ধতা আছে, তাই প্রত্যেকটি সেবার ডেলিভারি টাইম কমিয়ে আনতে হবে। এখানেই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। বর্তমানে একটি বিমান প্রায় দেড় থেকে ২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়, কিন্তু হাব হতে গেলে বিমান এত সময় বসিয়ে রাখার সুযোগ থাকবে না। ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে বিমান উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। যেমন এয়ার এশিয়া তাদের বিমান ২৮ মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত করে নেয়। আমরা শুরুতে এটি না পারলেও পরে ১২ জন কর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে এখন ঢাকা বিমানবন্দরেই ২৮ মিনিটে ন্যারো বডি বিমান পুশব্যাক করতে পারছি। এ দক্ষতা বিমান উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ব্যাগেজ ডেলিভারি এবং ইমিগ্রেশনসহ সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে।

এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমাদের দক্ষ জনবলের পরিস্থিতি কেমন?

সামগ্রিকভাবে আমাদের দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের একটি ভালো দল থাকলেও এভিয়েশন হাব গড়ে তুলতে পুরো ইকোসিস্টেম, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং ব্যাকওয়ার্ড-ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ তৈরি করতে হবে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে প্রায় ছয় হাজার কর্মী প্রয়োজন হবে। অথচ দেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, লোডিং বা ট্রাফিকিংয়ের মতো কাজে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সনদ দেয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আইএটিএ ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ কর্মী এখনো কাজ করতে করতেই শেখেন। আমাদের দেশের মানুষের শেখার সক্ষমতা ভালো, কিন্তু শিল্পকে বড় করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বর্তমানে আমাদের পাইলটদের সিমুলেটর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যেতে হয়, এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ভবিষ্যতে দেশে ২০০টি বিমান পরিচালনা এবং একটি কার্যকর এভিয়েশন হাব গড়ে তুলতে হলে দেশেই ফ্লাইট সিমুলেটর ও পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। কারণ ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ছয় লাখ পাইলট ও প্রকৌশলীর ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিমানের সি-চেক ঢাকাতেই করা সম্ভব। তবে বোয়িং উড়োজাহাজগুলো ১২ বছরের বেশি পুরনো হওয়ায় রেট্রোফিটের জন্য বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে, এতে ৭-৮ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এমনকি সিটের প্লাস্টিক মেরামতের মতো দেশীয় শিল্পও নেই। তাই এভিয়েশন হাব গড়তে দেশীয় বিমান পরিবহনকে টেকসই করার পাশাপাশি শক্তিশালী এমআরও সুবিধা তৈরি করতে হবে। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রানওয়ে। বর্তমান রানওয়ের দুই দফা ওভারহোলে হয়েছে; ২০৩৫ সালের পর এটি নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। জায়গার সীমাবদ্ধতায় দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণও কঠিন। কারণ একটা রানওয়ে থেকে আরেকটার মধ্যে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্ব প্রয়োজন।

আরেকটি বড় সমস্যা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সঠিক বণ্টন না হওয়া। ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩০০ ফ্লাইটের মধ্যে ১৪০টিই অভ্যন্তরীণ। এর একটি অংশ অন্য বিমানবন্দরে সরানো গেলে শাহজালালের ওপর চাপ কমবে। তেজগাঁও বিমানবন্দর উপযোগী থাকলে সেখানে অভ্যন্তরীণ ও টার্বোপ্রপ ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ ছিল। এখন সেটি সম্ভব না হলেও আশপাশে বিকল্প বিমানবন্দর বা সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, ডিজিটাইজেশন ও দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে হবে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সেলফ-চেকইন, অ্যাপভিত্তিক চেকইন ও ব্যাগ ড্রপের মতো সেবা চালু রয়েছে। অ্যাপসের মাধ্যমেও চেকইন করে ফেলা যাচ্ছে। কেএলআইএ-২-এর (মালয়েশিয়ার স্বল্প খরচ এবং বাজেটে আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলোর প্রধান বিমান চলাচল কেন্দ্র) এয়ার এশিয়া যে টার্মিনাল থেকে পরিচালনা হয়, সেখানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ফ্লাইট অপারেট করে, যেখান থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই কাউন্টারে যাচ্ছেন না। ঢাকা বিমানবন্দরেও যানজট ও যাত্রী হয়রানি কমাতে শতভাগ ডিজিটাইজেশন প্রয়োজন।

এমআরও বা মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার ও ওভারহোলিং খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো কোথায়?

প্রধান বাধা আমাদের পলিসি। বাংলাদেশে একটি বাজেট ক্যারিয়ার প্রয়োজন, যা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদা মেটাবে। ২০০১ সালে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস মাত্র চার মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করত। পরবর্তী সময়ে বাজেট ক্যারিয়ার হিসেবে এয়ার এশিয়া আসার পর তারা নিজেদের বাজেট এবং বাজার তৈরি করে। ২০২৫ সালে তারা প্রায় ১০০ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে, এ বছর এক বিলিয়নে পৌঁছার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশেও বাজেট ক্যারিয়ারকে নীতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, একই সঙ্গে বাজেট টার্মিনালও প্রয়োজন।

চট্টগ্রামকে এমআরও ও আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে বন্ডেড ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ব্যয় কমানো প্রয়োজন। বিদেশী বিমানের টেকনিক্যাল ল্যান্ডিংয়ে জ্বালানি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি ক্যাটারিং ও লন্ড্রি সেবার মতো সহযোগী ব্যবসাগুলোর মান উন্নত করতে নীতিগত সংস্কার বা সহায়তা জরুরি।

দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

এখানে উদ্যোগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় বিমান সংস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির বিমান থাকার পরও সংস্কৃতির অভাবে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। এ কালচারাল শিফট অত্যন্ত জরুরি। সরকার যদি নীতিগত সহায়তা দেয় এবং বেসরকারি খাতকে আমন্ত্রণ জানায়, তবে দেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের পুরনো ফ্লাইং ক্লাবগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দিয়ে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যেতে পারে। একইভাবে উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা থাকলে এমআরও বিল্ডআপ করার জন্য অনেকেই বাংলাদেশে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।

দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর আর্থিক ও পরিচালনগত সংকট কাটাতে কর ও রাজস্ব কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?

আমাদের নীতিগুলোকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বর্তমানে একজন যাত্রী পরিবার নিয়ে অথবা প্রবাসী শ্রমিক যখন মালয়েশিয়া যান, তখন তাকে টিকিটের চেয়েও বেশি কর বা ট্যাক্স দিতে হয়। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক। করের হার যৌক্তিক করা গেলে তাদের যাতায়াত বাড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে। বিদেশী উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণে কর-শুল্ক কমানো গেলে এভিয়েশন খাত থেকে বছরে ১০-১৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এখনই নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমান বিমানবন্দর দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর হাব পরিচালনা কঠিন হবে। তাই ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে নতুন বিমানবন্দর নিশ্চিত করা জরুরি, এর কোনো বিকল্প নেই।

আগামী ১০-১৫ বছরে দেশের এভিয়েশনকে কোথায় দেখতে চান, সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নীতিগত সংস্কার ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। এ মহাপরিকল্পনা মনিটরিং ও বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের স্ট্র্যাটেজিক কমিটি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে এগিয়ে নিতে সরকারি বিমানের মতো সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, যার মধ্যে নতুন বিমানবন্দর স্থাপন এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের উন্নয়ন অন্যতম। বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে এভিয়েশন শিল্প দেশের তৈরি পোশাক খাতের মতোই একটি বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। বর্তমানে এ খাতে ৮-৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আছে, যা বিপুল পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে।

আরও