মিলছে না বিদেশী ব্যাংকগুলোর নতুন ক্রেডিট লাইন

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ নেমেছে ৩.৮০ বিলিয়ন ডলারে

দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বেসরকারি খাতের বিকাশে তেমন কোনো আমদানি নেই। ‘কান্ট্রি রেটিং’ খারাপ হওয়ায় বিদেশী ব্যাংকগুলোও আগের মতো ক্রেডিট লাইন দিচ্ছে না। দেশের এক ডজনের বেশি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য থেকে অনেকটাই ছিটকে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৮০ কোটি বা ৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। অথচ গত অর্থবছরের শুরুতে ছিল ৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার ধারণক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার ক্ষেত্রে নস্ট্রো হিসাবের ডেবিট ব্যালান্স এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (ওবিইউ) বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ২৬ ফেব্রুয়ারি এ রিজার্ভের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর ডলার ধারণের যে পরিমাণ উঠে এসেছে, সেটিকে অর্থনীতির দুর্বল দিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বেসরকারি খাতের বিকাশে তেমন কোনো আমদানি নেই। ‘কান্ট্রি রেটিং’ খারাপ হওয়ায় বিদেশী ব্যাংকগুলোও আগের মতো ক্রেডিট লাইন দিচ্ছে না। দেশের এক ডজনের বেশি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য থেকে অনেকটাই ছিটকে গেছে। এ কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এত কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অবশ্য বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের আগে আমদানির অনেক এলসি (ঋণপত্র) ডেফার্ড হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে ওই সময় ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে ডলারের স্থিতি ছিল বেশি। গত দেড় বছরে বিলম্বিত সব এলসি দায় পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এটিও ঠিক, বিদেশী ব্যাংকগুলো এখন আর আগের মতো ক্রেডিট লাইন দিচ্ছে না। কান্ট্রি রেটিং খারাপ হওয়ার বিরূপ প্রভাবও এক্ষেত্রে পড়েছে।

আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ কমলেও নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) ঠিক আছে। রেমিট্যান্সে উচ্চপ্রবৃদ্ধি হওয়ায় প্রায়ই কিছু ব্যাংকের এনওপি নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ হলে দেশে বিনিয়োগ ও আমদানির চাহিদা বাড়বে। আশা করছি, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভও বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ধারণকৃত ডলারের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে এ রিজার্ভ ৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ কমতে থাকে। ওই অর্থবছর শেষে তথা ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর ধারণকৃত ডলারের পরিমাণ ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। আর চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এটি আরো কমতে থাকে। গত নভেম্বরে রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে কমে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসে ৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নামে।

আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী রেটিং এজেন্সিগুলো গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কান্ট্রি রেটিং বা ঋণমান অবনমন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী ‘বিগ থ্রি’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঋণমান নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ রেটিং। এ তিন প্রতিষ্ঠানের রেটিংয়ের মধ্য দিয়ে কোনো দেশের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রকাশ পায়। ২০২২ সালের পর থেকেই এ তিন রেটিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ঋণমান কমানো শুরু হয়।

কান্ট্রি রেটিং খারাপ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত না হওয়ায় দেশের ব্যাংকগুলোকে এলসি খুলতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকগুলোর গ্যারান্টির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের এলসির গ্যারান্টির বড় অংশই দেয় মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাংকগুলো। ভারত ও ইউরোপ-আমেরিকার বৃহৎ ব্যাংকগুলোও কিছু এলসির গ্যারান্টার হয়। এজন্য বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য একটি ঋণসীমা অনুমোদিত থাকে।

ডলার সংকটের কারণে ২০২৩ সালের শেষের দিক থেকেই বিদেশী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য তাদের ঋণসীমা কমিয়ে আনতে থাকে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতি আরো বেশি নাজুক হয়। ওই সময় ১৫টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয়া, তারল্য সংকট ও নানা নেতিবাচক প্রচারণার কারণে বিদেশী অনেক ব্যাংকই বাংলাদেশের কিছু ব্যাংকের এলসি নিচ্ছিল না। এমনকি যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বেশ ভালো তাদের জন্যও ঋণসীমা কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। এলসি খোলার জন্য দেশের ব্যাংকগুলোকে বাড়তি কমিশন বা ফিও গুনতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে নতুন ঋণ আসছে খুবই কম। বিপরীতে আগে আসা ঋণই বেশি পরিশোধ করা হচ্ছে। দেশের উদ্যোক্তারা আগে বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে বায়ার্স ক্রেডিট নিতেন। কিন্তু সুদহার বেশি হওয়ার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতার কারণে এখন বায়ার্স ক্রেডিট নেয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লিমিটও কমিয়ে দিয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ স্থিতি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসবের প্রভাব রয়েছে।’

‘থার্ড পার্টি গ্যারান্টি’ হিসেবে আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বেশি ব্যবসা রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক মাশরেক ব্যাংকের সঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ব্যাংকটি বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংকেরই এলসির গ্যারান্টার হয়। গত দুই বছরে এ ব্যাংকটি বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকেরই ঋণসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। ভারত, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কিছু ব্যাংক ঋণসীমা কমিয়ে দিয়েছে বলে ব্যাংক নির্বাহীরা জানিয়েছেন।

ইউরোপের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা রয়েছে জার্মানির কমার্স ব্যাংকের। এ ব্যাংকও দেশের কিছু ব্যাংকের এলসি নিচ্ছে না। তবে অস্থিরতার মধ্যেও এক্ষেত্রে ভালো ব্যবসা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ। গত তিন বছর ধরে বহুজাতিক এ ব্যাংকটির বাংলাদেশ অফিস রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে।

দেশে আমদানি-রফতানি তথা বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হতো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মাধ্যমে। গত তিন বছরে ব্যাংকটির এ কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে। আমিরাতভিত্তিক মাশরেক ব্যাংকসহ বিদেশী অনেক ব্যাংক এখন আর ইসলামী ব্যাংককে ক্রেডিট লাইন দিচ্ছে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হতে যাওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ার প্রভাবও রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরাই দেশের সেরা ব্যাংক ছিলাম। গত কয়েক বছরের অনিয়ম ও বিতর্কের কারণে বিদেশী অনেক ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখন সেসব সম্পর্ক আবার নতুন করে তৈরির চেষ্টা করছি। তবে বিদেশী অনেক ব্যাংকই এখন আর বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংককে নতুন ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি দিচ্ছে না। মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য আমদানিও খুব বেশি নেই।’

এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ধারণকৃত ডলারের স্থিতি কমলেও গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে গত ৩০ মার্চ তা বেড়ে ২৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে গ্রস রিজার্ভ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার কিনে নিয়েছে।

আরও