বেতন না হওয়ায় বন্ধ সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের সেবা

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে অর্ধলক্ষাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু

সাড়ে ১০ বছরের রোকেয়া। বাড়ি সিরাজগঞ্জ। জন্মের পর থেকেই জড়োসড়ো হয়ে পড়ত শিশুটির হাত-পা। মাঝেমধ্যে নীলাভ আকার ধারণ করত ঠোঁট-জিহ্বা।

সাড়ে ১০ বছরের রোকেয়া। বাড়ি সিরাজগঞ্জ। জন্মের পর থেকেই জড়োসড়ো হয়ে পড়ত শিশুটির হাত-পা। মাঝেমধ্যে নীলাভ আকার ধারণ করত ঠোঁট-জিহ্বা। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হওয়ায় তিন মাস বয়সে শিশুটিকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় তার পরিবার। কিন্তু রোগ ধরা পড়ে না। সমস্যাগুলো নিয়েই সে বাড়তে থাকে। চলে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একসময় জানা যায়, শিশুটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি তাকে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসক। এর পর থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্রে’ চলছিল রোকেয়ার কাউন্সেলিং। তবে কেন্দ্রটি হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটির পরিবার।

সিরাজগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রোকেয়ার বাবা রাকিবুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২১ সালে স্থানীয় শিশু বিকাশ কেন্দ্রটি চালু হওয়ায় আমার মেয়ের মতো অসংখ্য শিশুর সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আমার মেয়ের অনেকটা উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু সাত-আট মাস ধরে কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় আর কাউন্সেলিং করানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আবারো ওর সমস্যা বেড়ে গেছে।’

আর্থিক কারণে বেসরকারি কেন্দ্রে নিয়ে সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে শিশুটির বাবা বলেন, ‘মাত্র ১০ টাকার টিকিটে যেখানে সেবা পাওয়া যেত, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে বহন করা তা সম্ভব নয়। তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যার উন্নতির জন্য সরকারি সেবা কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে চালুর দাবি জানাচ্ছি।’

সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটিই নয় কেবল, সারা দেশের ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের প্রায় সবক’টিতেই সেবাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে ৫০ হাজারের অধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্বাস্থ্যসেবা অধিপ্তরের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার লক্ষ্যে গড়ে তোলা শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও কর্মীরা ১০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। তাদের চাকরি আছে কি নেই, সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য জানানো হচ্ছে না। তাই চিকিৎসকসহ অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। আবার যারা আছেন তাদের বেতন কবে হবে, সে নিশ্চয়তাও নেই। সে কারণেই শিশু বিকাশ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবাদান কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা এবং ইন্দ্রীয় বিকাশের সুযোগ বাড়াতে ২০০৮ সালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়। পরের বছর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির অধীন হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় পাঁচটি কেন্দ্রের মাধ্যমে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১০ ও ২০১৪ সালে আরো পাঁচটি করে ১০টি কেন্দ্র বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালের মার্চে আরো ২০টি কেন্দ্র যুক্ত হয় এ প্রকল্পে। এ ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪টি ও জেলা সদর হাসপাতালে রয়েছে ১১টির কার্যক্রম।

প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট, অফিস ম্যানেজার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। এছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাল্টিডিসিপ্লিনারি ট্রেনিং সেন্টারে বিভিন্ন বিষয়ের ইনস্ট্রাক্টর, কো-অর্ডিনেটরসহ মোট ১১ জন রয়েছেন। এ প্রকল্পের অধীনে কাজ করা সব মিলিয়ে মোট ১৮৬টি পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু চলতি মাসসহ ১০ মাস ধরে বেতন আটকে থাকায় এসব স্বাস্থ্যকর্মী কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এরই মধ্যে সাতজন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী ও দুজন ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট পদত্যাগ করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (ডেভেলপমেন্ট থেরাপি) মহসীনা সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেতন না পাওয়ায় চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী—প্রতিটি কেন্দ্রের পাঁচ স্বাস্থ্যকর্মীর কেউই কাজে আগ্রহ পাচ্ছেন না। আবার কেন্দ্রগুলোর সেবা কার্যক্রম এমন যে কোনো একজন কাজ না করলে পুরো সার্ভিস চেইন বন্ধ থাকে। ফলে সব কেন্দ্রে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।’

বেতন না পেয়ে কর্মীদেরও দুর্বিষহ জীবন কাটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেতন না পাওয়ায় সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ফেনী কেন্দ্রের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আবু তাহের। চাপ সহ্য করতে না পেরে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে স্ট্রোক করেন তিনি। পরে গত ৩১ জানুয়ারি অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসা তিনি মারা যান।’

শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অটিজম, স্নায়ুবিকাশ বৈকল্যজনিত সমস্যা (এনডিডি), শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক সমস্যা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, দেরিতে কথা বলা ও কথা বলতে সমস্যা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, অতিচঞ্চলতা ও মনোযোগের অভাব, খিঁচুনি ও মৃগীরোগ, শিক্ষণ প্রতিবন্ধিতা, আচরণগত সমস্যার সেবা দেয়া হয়। বয়স অনুযায়ী নির্ণয় করা হয় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ। পাশাপাশি শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতা বুদ্ধি ও আচরণ মূল্যায়ন, পজিটিভ প্যারেন্টিং, কাউন্সেলিং (শিশু ও পরিবার), বিহেভিয়ার থেরাপি, ট্রমা থেরাপি (ইএমডিআর), কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (সিবিটি) এবং ট্রানজেকশনাল অ্যানালাইসিস থেরাপির (টিএ) সেবাও দেয়া হয়।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৪৪ হাজার ৪৪২টি শিশু সেবার আওতায় এসেছিল। এর আগের ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে যথাক্রমে ৫৩ হাজার ৮১৭ ও ৫৬ হাজার ১৭২টি শিশুকে বিশেষ সেবা দেয়া হয়। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলেও যথাক্রমে ২৬ হাজার ৪৭৫ ও ১৯ হাজার ২২১টি শিশু সেবা গ্রহণ করে। সে হিসাবে গত বছরের জুন থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে অর্ধলক্ষাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

একটি শিশুর একাধিক সমস্যা থাকতে পারে। ফলে একাধিক সেবা দিতে হয়। এ ভিন্ন ভিন্ন সেবা দেয়ার জন্য রয়েছেন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট ও শিশু মনোবিজ্ঞানী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শিশুকে একই সেবা একাধিকবার নিতে হয়। সে হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৯টি সেবা দেয়া হয়েছে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয়। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেয়া হয় যথাক্রমে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬৩ ও ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৮টি সেবা। তবে কর্মীদের বেতন না হওয়ায় বর্তমানে শিশু কেন্দ্রগুলোর সেবা বন্ধ রয়েছে।

শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর এমন পরিস্থিতির কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয় সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য সেক্টর কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের জন্য বার্ষিক ১০-১২ কোটি টাকা বাজেট দেয়া হতো। কিন্তু সেক্টর কর্মসূচি সমাপ্ত হওয়ায় এবং রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর না হওয়ায় শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কোনো বরাদ্দ নেই। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুন পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয়েছে। এর পর থেকে এসব কেন্দ্রের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে। সে হিসাবে চলতি মাসসহ ১০ মাস ধরে বেতন পান না তারা। প্রথম কয়েক মাস বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে অনেকে আর নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন না। আমরাও তাদের জোর করতে পারছি না। তাই কেন্দ্রগুলোয় সেবা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।’ দ্রুতই এ সংকট কাটিয়ে কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ প্রতিবেদন ২০২১-এ বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী। তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহারে ব্যর্থ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে সব প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সম্মিলিত স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন চিকিৎসাসেবা একান্ত জরুরি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা বড় হওয়ার পর সামাজিক বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও তাদের অপমান করেন। সে কারণে দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি স্কুলে যায় না। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। বয়স হয়ে গেলেও এ সমস্যা থেকে আর পরিত্রাণ মেলে না। তাই শৈশবে এমন লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে বিকাশ কেন্দ্রে পরিচর্যা ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা উচিত। সাধারণত শিশুর বয়স ১০-১২ বছরের অধিক হলে আর চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ থাকে না। তাই সুস্থ জাতি গঠনে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো সবসময়ের জন্য খোলা রাখা উচিত।

আরও